default-image

ছোটবেলায় দেখা ‘হিমু’ নাটকের একটি দৃশ্য মনে পড়ে গেল। ছেলে মবিন ‘হিমু’ হয়ে যাচ্ছে বলে চিন্তিত বাবা তাঁর মিলিটারি শ্যালককে খবর দিয়ে এনেছেন। অবস্থা ভীষণ সিরিয়াস। সে এখন ভিক্ষুকদের সঙ্গে মিশছে, মাঝেমধ্যে ভিক্ষাবৃত্তি করছে। জীবনের প্রথম কামাই ১০০ টাকার মতন সে কামিয়েছে ভিক্ষা করে, যার অর্ধেকটা সে বাবাকে দিয়েছে, বাকি অর্ধেক মাকে।

মিলিটারি মামা সঙ্গে করে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট নিয়ে এসেছেন। নাম ‘প্রফেসর খান মজলিশ’, তাঁর মাধ্যমেই মবিনের মাথা থেকে ‘হিমুর ভূত’ ছাড়ানো হবে।

মহাপ্রস্তুতি নিয়ে তাঁরা মবিনের সঙ্গে কথা বলতে গেলেন। মামা মিলিটারি কায়দায় ধমকাতে থাকেন, ‘হু ইজ হিমু? থাকে কোথায়? ওর টেলিফোন নম্বরটা কী?’

ভাগনে মামাকে আশ্বস্ত করে বলে, ‘আমরা খাই, ঘুমাই, চাকরি করি এবং একটা সময়ে মরে যাই। এখন যদি তুমি মারা যাও, তুমি জানতেও পারবে না, জোছনার আসল সৌন্দর্যটা কী!’

মামা ধমক দিয়ে বলেন, ‘জোছনার আবার আলাদা সৌন্দর্য কী? আমি জোছনা দেখিনি?’
মবিন বলে, ‘দেখেছ, কিন্তু হিমু যেভাবে জোছনা দেখে, সেভাবে যদি দেখতে, তাহলে পৃথিবী সম্পর্কে তোমার ধারণা পাল্টে যেত।’
‘হিমু হারামজাদাটা জোছনা দেখে কী করে?’
‘হিমুর মতে জোছনা জঙ্গলে গিয়ে দেখতে হয়।’

এবার সাইকিয়াট্রিস্ট বললেন, ‘আচ্ছা, আমরা জোছনা দেখতে বনে গেলাম, তারপরে?’
মবিন বলে, ‘জোছনা দেখতে হবে গাছ হয়ে। হিমুর মতে, জোছনা দেখতে হলে জঙ্গলে গর্ত খুঁড়তে হবে।’

default-image

মামা বলেন, ‘গর্তে বসে জোছনা দেখতে হবে? ফাজলামির একটা সীমা থাকা দরকার!’
মবিন বলে চলে, ‘গলা পর্যন্ত মাটিচাপা থাকবে। শুধু মাথাটা বাইরে থাকবে। এতে গাছের কিছু গুণাগুণ আপনার মধ্যে চলে আসবে। আপনি নড়তে পারবেন না। আপনি প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। আপনার মধ্যে প্রবল আবেগ তৈরি হচ্ছে। পুরো ব্যাপারটা দারুণ স্পিরিচুয়াল!’

মামা ততক্ষণে মবিনের কথায় বশীভূত হয়ে গেছেন। তিনি আগ্রহের সঙ্গে বললেন, ‘তুই করেছিস এমন?’

‘অবশ্যই করেছি। করেছি বলেই তো বলতে পারছি। সে এক অসাধারণ ব্যাপার! কী অভিজ্ঞতা! রাত গভীর হচ্ছে! মাথার ওপর জোছনা প্রবল হচ্ছে। আপনার সমস্ত শরীর আনন্দে থরথর করে কাঁপছে! তখনই বুঝতে পারবেন, মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার সার্থকতা! মানুষের জীবন শুধু খাওয়া এবং ঘুমানোর জন্য তৈরি হয়নি।’
মামা বললেন, ‘চল যাই! জোছনা দেখে আসি।’

ঠিক তেমনই, গ্রীষ্মপ্রধান দেশে জন্ম নেওয়ায় তুষারপাত সম্পর্কে আমাদের কোনোই ধারণা ছিল না, যা অভিজ্ঞতা, সবই গল্পের বইয়ের মাধ্যমে। লেখকেরা খুবই রোমান্টিকভাবে সেসব দৃশ্য চিত্রিত করেন।

বিজ্ঞাপন

দিগন্তবিস্তৃত শ্বেতশুভ্র তুষারে চারদিক আবৃত থাকে। যেদিকে দৃষ্টি যায় কেবল সাদা আর সাদা। মনে হয় না সবুজ শ্যামলিমা পৃথিবীতে আছি। মনে হবে যেন কোনো রূপকথার দেশের মেঘের রাজ্যে চলে এসেছি। মেঘের বাড়িঘর, মেঘের মাঠঘাট, প্রান্তর! পেঁজা তুলোর মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তুষারকণা আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে। ধরতে গেলেই যা হাতে গেলে যায়। গাছের ফাঁকে ফাঁকে এমনভাবে জমা হচ্ছে, দেখে মনে হয় অগণিত শ্বেতবর্ণের ফুল ফুটে আছে। ছোট ছেলেমেয়েরা স্নো-ম্যান বানাতে ব্যস্ত। তরুণ–তরুণীরা একে অন্যের গায়ে ছুড়ে মারছে তুষারের বল, শরীরে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই যা গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। তারপরে খিলখিল অনাবিল হাসতে হাসতেই তুষারের ওপর গড়াগড়ি। এরই মধ্যে সূর্যের নরম আলো কিংবা চাঁদের কোমল নীল জোছনা পিছলে যাচ্ছে তুষারকণায়। চারদিকে কত রহস্যময়, মায়াবী পরিবেশ! চারদিকে কত স্বর্গীয় আনন্দ!

এমন তুষারপাতে বাড়িতে বসে থাকার কোনো মানেই হয় না। মানুষের জন্ম বাড়ির কোণে বসে থাকার জন্য হয়নি। সে জন্মেছে সৌন্দর্যকে ছুঁয়ে দেখতে। দুই হাত প্রসারিত করে সৌন্দর্যকে আলিঙ্গন করতে। তাই এমন দিনে সবার উচিত বাইরে বেরিয়ে এসে প্রকৃতির এই বিস্ময় পূর্ণভাবে উপভোগ করা।
এবারে নাটকে ফেরা যাক।

নাটকের পরের দৃশ্যে দেখা গেল মামা, ভাগনে ও সাইকিয়াট্রিস্ট গাড়িতে করে জঙ্গলের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছেন। জঙ্গলে গর্ত খুঁড়ে মামা ও সাইকিয়াট্রিস্ট দুজনই গর্তে ঢুকে গেছেন। তাঁদের শরীর গলা পর্যন্ত মাটিচাপা দেওয়া। ভাগনে তাঁদের জঙ্গলে একা ফেলে ঢাকায় চলে আসে।

রাত গভীর হতে থাকে। জোছনাও প্রবল হতে থাকে।
এই সময়ে মামা বলেন, ‘প্রফেসর খান মজলিশ?’
‘জি?’
‘আমার তো মনে হয় আমরা বিরাট বোকার মতন কাজ করে ফেলেছি। আপনার কী ধারণা?’
‘আমার ধারণাও সে রকমই।’
‘তাহলে এখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় কী?’
‘কোনো উপায় তো মাথায় আসছে না।’
‘বাঁচাও বলে চিৎকার করলে কি কোনো লাভ হবে?’
‘কোনো লাভ হবে না। আমরা এখন গভীর বনে।’
তারপর একটু সময় নিয়ে প্রফেসর খান মজলিশ টেনে টেনে বললেন, ‘তা জোছনা কেমন দেখছেন?’

মামার উত্তরে যাওয়ার আগে আমাদের তুষারপাতের অভিজ্ঞতা বলা যাক।

টেক্সাসে তুষার পড়ে না। তাই এখানকার ইলেকট্রিক কোম্পানিগুলো তীব্র গরমের জন্য প্রস্তুত থাকে, চরম শীতের জন্য না। কাজেই হঠাৎ আসা এই ঝড়ে সব সিস্টেম ওলট–পালট হয়ে গেল। ইলেকট্রিসিটির ওপর তীব্র চাপ সামলাতে যেগুলো জরুরি সংস্থা, যেমন হাসপাতাল ও অন্যান্য, সেখানে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতেই অন্য অনেক অঞ্চলেই বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো।

আমার এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না প্রায় ১৬ ঘণ্টার মতো। সকালে প্রতিবেশী ভদ্রলোক এসে বলে গেছেন তাঁদের জেনারেটর আছে, হিটারের প্রয়োজন হলে যেন অবশ্যই তাঁর বাড়িতে চলে আসি।

একজন আদর্শ প্রতিবেশীর দায়িত্ব তিনি পালন করলেন।
ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, কোনো সমস্যা নেই। আমরা ঠিক আছি। যদি প্রয়োজন হয়, আসব।

ধারণা ছিল দু–তিন ঘণ্টার মধ্যেই কারেন্ট আসবে। রাতে কারেন্ট গেছে। ততক্ষণই–বা সময় লাগবে ফেরত আসতে? বন্ধুবান্ধব, পরিচিতদের দু–তিন ঘণ্টার জন্য যাচ্ছে, আসছে, আবার যাচ্ছে। আমাদের আসবে না?

দুপুর চলে গেল, কোনো খবর নেই। বাড়ির ভেতরের কোনো কোনো অংশের (হাইসিলিং ওপেন স্পেস যে স্থানে, সিঁড়ির দিকে) তাপমাত্রা এতটাই নেমে যায় যে সেখানে কথা বলার সময়ে মুখ দিয়ে ধোয়ার মতন কুয়াশা বেরোচ্ছিল।

ইন্টারনেট নেই, অফিসে লগইন করতে পারছি না। জরুরি মিটিং ছিল আগামীকাল, বললাম ইচ্ছা আছে করার, কিন্তু ইন্টারনেট না থাকলে থাকব কীভাবে? ডেন্টিস্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল, সেটাও বাতিল। বাচ্চাদের স্কুল আগামী দুদিনের জন্য ছুটি। ফোনের চার্জ যেন শেষ না হয়, সে জন্য ফুলচার্জ দিয়ে রাখছি। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে ওটা কাজে আসছে।

default-image

সবাই বাড়িতে ফায়ার প্লেস জ্বালিয়ে বসে আছে। আমার ফায়ার প্লেসটা পর্যন্ত ইলেকট্রিক। খেলাম ধরা সবদিক দিয়েই।

প্রতিবেশী কয়েকজনের বাড়িতে দেখলাম জেনারেটর চলছে। এ দেশে কারেন্ট যায় না বছরে এক দিনও। তারপরও এরা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ডলার দিয়ে জেনারেটর কিনে গ্যারেজে ফেলে রাখে! এত দিন মনে হতো ওদের পয়সা চুলকায়। এখন বুঝলাম এর প্রয়োজনীয়তা।

অবশ্য জেনারেটরের আরও অনেক কাজ আছে। ওরা আউটিং টাউটিং করে খুব। ওদের আরভি চালাতেও বোধয় জেনারেটরের প্রয়োজন হয়। সব বড়লোকি কাজকারবার!

গ্যাস কোম্পানি থেকে টেক্সট ম্যাসেজ পাঠাল, গ্যাসের ওপর যেন চাপ কমানো হয়। না হলে অতিরিক্ত চাপে গ্যাসও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারেন্ট না থাকলেও গ্যাস থাকায় অন্তত রান্নাবান্না চালানো গেছে। মাথায় একটা ব্যাকআপ প্ল্যান ছিল এই যে ঠান্ডা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে সবাই চুলা জ্বালিয়ে চুলার পাশে বসে থাকব। এখন যদি গ্যাসও চলে যায়...
অবশ্য গ্যাসের জন্য হালকা ব্যাকআপ আছে। আমার গ্যারেজে দুই সিলিন্ডার গ্যাস পড়ে থাকে। মাঝেমধ্যে বাইরের চুলায় রান্নাবান্না করি, সেটাতে সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার করি। কিন্তু এই ঠান্ডায় বাইরে যেতেই তো হাড্ডি শুকিয়ে যায়।

বিকেলের দিকে এক ঘণ্টার জন্য তিনি এলেন। মানে কারেন্ট আরকি। যদি আমার বাড়িতে প্রেসিডেন্ট সদ্য সাবেক ফার্স্ট লেডিসহও আসতেন, এত আনন্দ পেতাম না। সব হিটার চালু করে দিলাম। বাড়ি গরম হোক। একটা পোর্টেবল হিটার ছিল, গ্যারেজ থেকে বের করে রুমে এনে সেটাও চালু করলাম। এর মধ্যেই তিনি আবার বিদায় নিলেন। মানে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা পরে এসে মাত্র ৪৫ মিনিটের জন্যও তিনি বসলেন না। এতই তাঁর তাড়া ছিল।

ভিভিআইপি আর কাকে বলে?

তারপরে আবারও প্রায় ছয় ঘণ্টার জন্য গায়েব।
অবশেষে গভীর রাতে তিনি আবার ফিরলেন।
এখন এক ঘণ্টার বেশি হলো, তিনি আছেন। যেকোনো মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যাবেন, বুঝতে পারছি। সেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। বাড়ি গরম করছি। এতটাই যেন শরীর থেকে রীতিমতো ঘাম ছুটতে শুরু করে।

এই সময়ে এখন কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তা তুষারপাত কেমন এনজয় করলেন?’

আমার জবাবটা তখন মুবিনের মামার মতন হবে।

ডাক্তার সাহেব যখন জিজ্ঞেস করলেন, ‘জোছনা কেমন দেখছেন?’ মামা তখন নিজের যাবতীয় রাগ মুখের কথায় এনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন, ‘শুয়োরের বাচ্চা জোছনা!’

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন