ক্রিস রক অনুষ্ঠান চলাকালে কৌতুক করে কটাক্ষ করলেন অভিনেতা উইল স্মিথের স্ত্রী জেডাকে নিয়ে। আর জনসম্মুক্ষে উইল স্মিথ থপাস করে থাপ্পড় মেরে কটাক্ষের প্রতিবাদও করলেন। কিন্তু প্রতিবাদের আগমুহূর্ত পর্যন্ত তৃতীয় ভাগে বিভক্ত মানুষ কিন্তু দাঁতের হালি বের করে হাসছিলেন। এ হাসিটা হয়তো অক্ষত থাকত, যদি প্রতিবাদটা না হতো। প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হলেও কেউ কিন্তু প্রতিবাদ না করার পক্ষে বলেননি। কৌতুকের ছলে কটাক্ষ করে কাউকে আঘাত করা যতটা সহজ, তার চেয়ে পাহাড়সমান কঠিন, তা নিতে পারা, আর তা যদি হয় পাবলিক মঞ্চে। এ প্রতিবাদের ভাষা যেমনই হোক, কিন্তু এর পর থেকে কারও সাফল্য বা দুর্বলতা নিয়ে কৌতুকছলে কটাক্ষ করতে গিয়ে দুবার ভাববে মানুষ, এটা নিশ্চিত। তবে আমাদের সমাজে বা চারপাশের পরিবেশ তো আর সেই লস অ্যাঞ্জেলেসের অস্কারের মঞ্চ নয়, যা নিরাপদ থাকবে। অথবা উইল স্মিথের মতো মানুষেরা থাপ্পড়ের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলবেন ‘ভালোবাসা এবং দয়ার পৃথিবীতে সহিংসতার কোনো স্থান নেই।’

সমাজে ধর্ষকের তুলনায় দর্শকই বেশি। আর যেহেতু অধিকাংশ দর্শকই মৌন, তাই ধর্ষকের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে নির্ভয়ে। নারীদের জন্য পৃথিবী অনিরাপদ অনেকটাই, দেশে দেশে সমাজে সমাজে তার হার কমবেশি হতে পারে। তবে, বিষয়টি সব জায়গার নারীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এ ক্ষেত্রে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া তো আরও একধাপ এগিয়ে।

কিছুদিন আগে এক নারী সেলিব্রিটি, যিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এক ভারতীয় নাগরিককে এবং এর জন্য অসংখ্যবার ইন্টারনেটের মাধ্যমে হ্যারাস হতে হয়েছে বা হচ্ছেন সেই নারী। একদিন তাঁর স্বাভাবিক শাড়ি পরা একটা পোস্টে আমি একটি পজিটিভ লাইন লিখেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু মানুষ আমাকে ধুয়ে দিলেন, কেন আমি সেই নারীকে সাপোর্ট করছি? আমার ফেসবুকের সব পাবলিক ছবি স্ক্যান করে আমাকে বুলিং করা শুরু হলো। তারপর আমার ধর্মকেও জড়াল, আর এই সবকিছুর জন্য সময় নিয়েছিল মাত্র ৩ মিনিট, খুব দ্রুততার সঙ্গে ঘটে গেল কাজটি। নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য পরে আমার কমেন্টটা ডিলিট করতে বাধ্য হই। গত সপ্তাহে সেই নারী অভিনেত্রীকে আক্ষেপ করে একটি সাক্ষাৎকারে বলতে শুনলাম, ‘আমার প্রতি সবচেয়ে বেশি সাইবার বুলিং হয়, কিন্তু কেউ কি তা দেখে বা প্রতিবাদ করে?’

আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, সেদিন আমি তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারিনি বলে। নিজের মানসিক সুস্থতার কথা ভাবলাম, কিন্তু তাঁর কথা কেন ভাবলাম না। যে প্রতিদিন মিলিয়ন কমেন্টের ৯৯ শতাংশ গালি নিয়ে দিনের শুরু বা শেষ করেন। সাইবার দুনিয়া কী ভয়াবহ, তা আমি মাত্র তিন মিনিটেই অনুধাবন করলাম।
ইভ টিজিংয়ের শিকার কাজী জেবুন্নেছা জামানের ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে কি দেখলাম? পুরা বাসে দুটি মানুষও তাঁর জন্য দাঁড়ায়নি, ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে ছিল সবাই, যেন তারপর কী হয় দেখি।

চারপাশে যা–ই হোক, আমরা মনুষ্যত্ব ভুলে গেছি, ভুলে গেছি প্রতিবাদ করতে, ভুলে যাই আমিও এই সমাজের অংশ। অন্যায়কারীকে প্রতিহত বা প্রত্যাখ্যান না করলে একদিন এই বিষাক্ত পরিবেশের জন্য আমরা দর্শকেরাই দায়ী থাকব। সাইবার বুলিং, অসম্মানজনক কৌতুক, ইভ টিজিং ও ধর্ষণ—সব রকমের অন্যায়কারীকে বয়কট করুন, এটাই হওয়া উচিত আপনার বিবেকের কাজ, সঠিক কাজ।

না, থাপ্পড়কে সমর্থন করছি না, কিন্তু প্রতিবাদটাকে পুরাপুরি সমর্থন করছি। এটার প্রয়োজন আছে সভ্যতার বিপরীতে চলা মানুষের জন্য। সেই সঙ্গে উইল স্মিথের মতো করে বলি ‘ভালোবাসা এবং দয়ার পৃথিবীতে সহিংসতার কোনো স্থান নেই।’ নারীবান্ধব হোক পৃথিবী ও ভার্চ্যুয়াল জগৎ। ‘জিরো টলারেন্স’ হোক নারীর বিরুদ্ধে ছোড়া সব অসম্মানজনক তির।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন