default-image

বাংলাদেশের পশ্চাৎপদ নিয়ে কথা উঠলে আমরা অনেকেই ইউরোপের সঙ্গে সেটার তুলনামূলক বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হই। ইউরোপের রাস্তা-ঘাটে-অফিস-আদালতে ভালো কিছু ঘটতে দেখলে বা শুনলে দেশের জন্য আমাদের মনটা উতলা হয়ে ওঠে। প্রায়ই তা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে শেয়ার করে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, ‘আহা এমন যদি হতো আমাদের দেশটা!’ মানুষ যেকোনো কিছু উচ্চ মানদণ্ডের সঙ্গে বিচার করতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইউরোপীয় রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংগীত, সিনেমা, ফ্যাশন, সামাজিক-মানবিক অগ্রগতি এমনকি তাদের আচার-আচরণ ইত্যাদি বিষয়ের কোনগুলোর সঙ্গে আমরা দেশে বিদ্যমান পরিস্থিতির তুলনা করতে পারি বা করা সংগত৷
আমাদের দেশের কিছু মানুষ অনেক বিষয়ে ইউরোপকে হুবহু অনুকরণ করেন। যেমন থার্টি ফার্স্ট নাইট, ভ্যালেন্টাইনস ডে ইত্যাদি এখন দেশে ব্যাপকভাবেই উদযাপিত হয়। আমেরিকান বা ইউরোপিয়ান ফ্যাশন এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। অকারণে ইংরেজ বাতচিত ফ্যাশন হয়ে গেছে। ভালো মানের ইংরেজ বলা ও লেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান অর্জন করতে হলে আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি ভালোভাবে রপ্ত করার কোনো বিকল্প নেই।
পাশ্চাত্য ক্লাসিক্যাল সংগীত খুব একটা পরিচিত না হলেও রিয়ানা বা শাকিরার মতো শিল্পীরা বাংলাদেশে কতটা জনপ্রিয় সেটা আমরা জানি। টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনেও আমরা অহেতুক পশ্চিমাদের নকল করছি। এমনকি ইউরোপীয়দের হাঁটন-বচনও আমরা অনায়াসে হুবহু কপি করি। আর বিদেশি নামের এমন ছড়াছড়ির দেশ পৃথিবীতে আর একটিও বোধ হয় নেই।

অন্যদিকে উদার সহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, সামাজিক আচার-আচরণ (এটিকেট-ম্যানারিজম অর্থে) বা ন্যায়বিচার, সুশাসন, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ইত্যাদি ইতিবাচক বিষয়ে পাশ্চাত্যকে অনুসরণ করার প্রবণতা বলা যায় আমাদের দেশের মানুষের মাঝে একেবারে অনুপস্থিত। কিছু মানুষ যে সেসব চর্চা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সমস্যা হলো কেউ যখন ইতিবাচক বিষয়ে পাশ্চাত্যকে অনুকরণ করার কথা বলে বা চেষ্টা করে, তখন অধিকাংশ মানুষ সেটাকে একবাক্যে ‘নাকচ’ করে দেন। এ ব্যাপারে আমরা সবাই মোটামুটি সহমত পোষণ করি যে এসব বিষয়ে পাশ্চাত্যের মানদণ্ডে পৌঁছার চেষ্টা করা অলীক স্বপ্ন। আবার অনেকের কাছে তা হাস্যরসের বিষয়। তাদের বক্তব্য, আমাদের দেশে ওসব কোনোদিনই হবে না।
তাহলে দেখা যাচ্ছে কিছু কিছু পশ্চিমা সংস্কৃতি আমরা খুব সহজে অনায়াসে গ্রহণ করি, চর্চা করি। অন্যদিকে জনকল্যাণমূলক কোনো পাশ্চাত্য সংস্কৃতি গ্রহণে চেষ্টাও করি না। যারা চেষ্টা করতে চায় নেতিবাচক মন্তব্য দিয়ে তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় বরফ-জল ঢেলে দিই।
যে ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করে আমরা হা হুতাশ করি, সেই ইউরোপ কীভাবে আজকের অবস্থানে এসেছে তা অনেকেরই জানা নেই। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর (পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যভাগে) কয়েক শ বছর তাদের জন্য ছিল অন্ধকার যুগ। সেই অন্ধকার থেকে বেরোতে লেগেছিল আরও কয়েক শ বছর। নিউটন (১৬৪২-১৭২৭) যখন পাশ্চাত্য বিজ্ঞান জগৎ​কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই সময় ইংল্যান্ডে ঋণখেলাপি হিসেবে অভিযুক্ত মৃত ব্যক্তিকে কবর থেকে তুলে ফাঁসিতে ঝোলানোর নজির রয়েছে। অনেকের হয়তো স্মরণ আছে বেশ ক বছর আগে শেক্সপিয়ারের জীবনী নিয়ে নির্মিত ‘শেক্সপিয়ার ইন লাভ’ ছবিটি। সে ছবিতে দুটো চরিত্র ছিল এলিজাবেথান লন্ডনে (১৬ শ শতাব্দী) নাট্যশালার মালিকের। একজন অভিনেতা রিচার্ড বারবেইজ, যিনি ছিলেন কার্টেইন থিয়েটার কোম্পানির মালিক আর অন্যজন ফিলিপ হেন্সলো, যার ছিল রৌজ থিয়েটার। দুটোর মধ্যে ছিল প্রতিযোগিতা। বারবেইজ বেশ সচ্ছল আর হেন্সলো কিছুটা অসচ্ছল। নাট্যশালা চালানোর জন্য প্রায়ই তাকে ঋণ করতে হতো। একবার সে হিউ ফেনিম্যান নামক লগ্নিকারবারির (সুদখোর) কাছ থেকে ১২ পাউন্ড ধার করে। কিন্তু তখন প্লেগের জন্য রাজকীয় ফরমানে সব নাট্যশালা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে। হেন্সলো ফেনিম্যানের টাকা সময়মতো ফেরত দিতে পারে না। ফেনিম্যানের মাসলম্যানরা হেন্সলোকে ধরে নিয়ে আসে। তারা তাকে বেঁধে চিত করে শুইয়ে বুটসমেত তার পা আগুনের ওপর ধরে রাখে। আর পাশে দাঁড়িয়ে ফেনিম্যানের বক্রোক্তি ছিল, ‘হেন্সলো তুমি কি জানো, যে লোক সময়মতো ঋণ পরিশোধ করে না তার ভাগ্যে কী ঘটে? তার বুট আগুনে পুড়ে!’ আর এলিজাবেথের (প্রথম) বড় বোন কুইন মেরির সময় ক্যাথলিক কর্তৃক প্রোটেস্ট্যান্টদের বা স্প্যানিশ ইনকুইজিটর কর্তৃক ইহুদি-মুসলমানদের পুড়িয়ে মারার কাহিনি তো ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছে। একবিংশ শতাব্দীতে আমরাও ভিন্নমাত্রায় সেটা করছি, আশ্চর্য হলেও সত্য প্রাচীন যুগেও আমরা এ রকম বর্বর ছিলাম না।
সেই বর্বর অবস্থা থেকে কয়েক শ বছরের চেষ্টা, অধ্যবসায়, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর অদম্য আগ্রহের বলে আজ পাশ্চাত্য দেশগুলো সারা বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কলোনিয়ালিজম তাদের উন্নতির জন্য সহায়ক ছিল। কিন্তু অন্য কোনো জাতির লোক এসে তাদের দেশ গড়ে দেয়নি। কোনো বিদে​শি ব্যাংক বা বিশেষজ্ঞ এসে তাদের উন্নয়ন-পরিকল্পনা লিখে দেয়নি। তবে হ্যাঁ, তারাও অন্য সভ্যতার কাছ থেকে শিখেছে। বিদেশি সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতি যা তারা নিজেদের দেশ গড়ার জন্য অপরিহার্য মনে করেছে তারা তাই শিখেছে। ২০০ বছর ভারতবর্ষ শাসন করার পরও তারা আমাদের আরামপ্রদ লুঙ্গি-পাঞ্জাবি বা শাড়ি পরা শেখা প্রয়োজন মনে করেনি। এমনকি ২০০ বছর পর গুটিকয়েক একাডেমিশিয়ান বা বিশেষজ্ঞ ছাড়া কেউ আমাদের ভাষা শেখারও প্রয়োজন বোধ করেনি বা এখনো করে না। তবে তারা ঠিকই শিখেছে আমরা তাজমহলে কী জ্যামিতি ব্যবহার করেছি। তাই তো দেখি তাদের রাজা চতুর্থ জর্জ ব্রাইটন প্যাভিলিয়ন তৈরি করার সময় তাজমহলের নকশা (indo-islamic architecture) নকল করার চেষ্টা করেছে। আমাদের শূন্যের ব্যবহার, গণিত, ত্রিকোণমিতি অ্যালজেবরা বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো বিষয় তারা ঠিকই শিখেছে। শুধু শিখেই সন্তুষ্ট থাকেনি। সেটাকে তারা এগিয়ে নিয়ে গেছে এমন উচ্চতায় যা আজ অন্য কোনো জাতি ছুঁতে পারছে না। এমনকি সুন্দর বাগান বা পার্কের গুরুত্বও তারা আরবদের কাছ থেকে শিখেছে।
আমাদেরও প্রথমে ঠিক করতে হবে, জাতির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক মুক্তির সংগ্রাম এগিয়ে নিতে পাশ্চাত্যের কোন বিষয় অনুসরণ বা অনুকরণে অগ্রাধিকার দোয়া উচিত। আমরা বিদেশিদের কাছ থেকে কোন জিনিসগুলো আগে শিখব। বিদেশিদের কোনটি আমাদের প্রয়োজন আর কোনটি নয়, সেটা আগে নির্ণয় করতে হবে। ফালতু জিনিস নকল করতে আমরা যতটা পারঙ্গম, সেই দক্ষতাকে সামষ্টিক জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায় নিয়োজিত করতে হবে সবার আগে। ইউরোপের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনায় হা হুতাশ না করে, নিরাশায় না ডুবে এবং অন্যদের না ডুবিয়ে—সেটাকে শক্তি সঞ্চয়ের উৎস হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। তাহলে আমাদেরও হবে একদিন।
(লন্ডন, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন