default-image

সুপার ফুড নামে নয়, তবে বড়দের মতে দারুণ উপকারী খাবার অনেক আগেও ছিল। ছোটদের অনেক কষ্ট করে ওই সব খাবার গলাধঃকরণ করতে হয়েছে। ছোটবেলায় মুরব্বি ও গুরুজনদের আদরের পাশাপাশি নানা শাসন আর দাবড়ানি সহ্য করতে করতেই প্রায় সব মানুষ বড় হয়। সময়ের স্রোত পেরিয়ে পরিণত বয়সে পৌঁছায়।

মাঝেমধ্যে মনে হয়, গুরুজনদের অনেক শাসন-বারণ অন্যায় পর্যায়ে পড়ে। রীতিমতো অত্যাচার। যেমন গরম ভাতের হাঁড়িতে থার্মোমিটার ঢুকিয়ে ভাতের জ্বর মাপা অন্যায় মানলাম। নতুন অঙ্ক খাতার সাদা পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে নৌকা বানিয়ে বৃষ্টির পানির নহরে ভাসানোও ঠিক নয় বুঝলাম। কিন্তু কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয় বারান্দায় এক চিমটি চিনি ছড়িয়ে পিঁপড়াকে দাওয়াত দিলে? তাতেও শাসন, তাতেও বারণ।

পিঁপড়ারা সারি বেঁধে কোথা থেকে আসে আর চিনি মুখে নিয়ে কোথায়ই-বা যায়, তা জানার ছোটবেলার সে ইচ্ছাটাই অপূর্ণ থেকে গেল। অথচ এখন ঘরে কৌটাভর্তি অনেক চিনি। এক চিমটি নয়, এক মুঠো ভর্তি করে নিলেও কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আজ ছোট্ট বেলাটাই উধাও হয়ে গেছে। কোন অজানায় গেছে, কেউ তা জানে না।

খাবারদাবার নিয়ে ছোটদের ওপর গুরুজনেরা অনেক জোরজবরদস্তি করতে পছন্দ করেন। বড়দের মতে (তাদের মত ঠিক কী বেঠিক, তা জিজ্ঞেস করার সাহস ছোটদের কারও ছিল না), যা স্বাস্থ্যকর খাবার তা ছোটদের খাওয়ানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন তাঁরা। বড়দের কথা মেনে অনেক বিস্বাদ খাবার ছোটরা খেতে বাধ্য হয়, এ কথা খাঁটি সত্যি। তবে খেতে খেতে একসময় ওই খাবার ভালো না লাগলেও তারা খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

আজকাল পশ্চিমা ধনী বিশ্বে সুপার ফুডের বিরাট আবেদন। একসময়ের ভেনেজুয়েলার গরিব মানুষের খাদ্য কিনওয়া, আর অন্য কোনো এক দেশের চিয়া, লিনসিড (সম্ভবত আমাদের দেশে এটাকে তিসি বলে) ধনীদের বিশ্বে এখন দারুণ জনপ্রিয়। আমাদের দেশে বলা হয় বা বলা হতো শাকপাতা গরিব-গোবরাদের খাবার। বর্তমানে অবাক হতে হয় দেখে, কেইল নামের ঘন সবুজ রঙের (বেগুনি রঙেরও পাওয়া যায়) কোঁকড়ানো পাতা যা কিনা সুপার ফুড নামে দারুণ জনপ্রিয়। শাকটি সস্তা মোটেও নয়। গরিবদের জন্য এসব এখন মহার্ঘ বস্তু। তারা ওই পাতা খেতে পায় বলে মনে হয় না।

আমাদের নানি-দাদি, মা, চাচি, খালারা করলা, কালিজিরাকে সুপার ফুড মনে করতেন। ওই সব বিরক্তিকর খাবার আমাদের ওষুধ খাওয়ানোর মতো জোর করে খাওয়াতেন। খাবারে যেদিন এসব পদ থাকত, সেদিন এক চামচ করলা ভাজি বা কালিজিরা ও শুকনো মরিচ ফোড়ন দিয়ে কুচি কুচি করে পলা পেঁপে ভাজি দিয়ে বিসমিল্লাহ করতে হতো। প্রথম গ্রাস বা লোকমা ওই বেমজা সুপার ফুড দিয়ে শুরু করা ছিল রেওয়াজ। ছোটদের ‘খাব না’ বলার সাধ্য ছিল না। কত ভুলকি-ভালকি দিয়ে যে খাওয়ানো হতো। করলার কত গুণ শুনতে শুনতে কান ব্যথা। আর কালিজিরা মহৌষধি! একদিন কালিজিরা থেকে মানুষ অমরত্বের ওষুধ বের করতে পারবে বলে মুরব্বিদের ধারণা।

ধীরে ধীরে করলা অল্প অল্প করে খেয়ে অভ্যাস হলো। মজা করে খেয়েও নিতাম। নিজের সন্তানদেরও এই সুপার ফুড খেতে এবং এটাকে পছন্দ করতে শিখিয়েছি।

তবে কালিজিরাভীতি দীর্ঘদিন ছিল। স্বচ্ছ হালকা সবুজ রঙা পেঁপে ভাজিতে কালো কালো ছোট ছোট কালিজিরা দেখতে মোটেও ভালো লাগত না। ছোটবেলায় লুকিয়ে চুরিয়ে কালিজিরা বেছে বেছে ফেলে পেঁপে ভাজি খেয়ে নিতাম। তবে পেঁপে ভাজিতে কালিজিরার গন্ধ মিশে থাকত, তা ছিল মজার। বড় হয়ে মায়ের হাতে বানানো নিমকিতে কালিজিরা ভালো লাগত। সুপার ফুড বলে নয়, এর স্বাদই তখন ভালো লাগত।

আজকাল পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন সাময়িকী খুললেই করলা, রসুন, কালিজিরা, হলুদসহ নানা খাবারের গুণের বিস্তারিত বর্ণনা চোখে পড়ে। পত্রিকাওয়ালাদের মুরব্বিরাও তাদের ওসব মূল্যবান সুপার ফুড খাইয়েছেন নিশ্চয়। অনেক সময় পরিচিত বন্ধুবান্ধব ই-মেইল বা মোবাইলেও মেসেজ করে এ বিষয়ে নানা তথ্য পাঠিয়ে থাকেন। বোধ হয় সুপার ফুড নিয়ে মানুষ এখন ভীষণ ব্যাকুল।

কালিজিরার তেল এখন বাজারে পাওয়া যায়। বিদেশেও দেশি সংসারী শপে এই তেল পাওয়া যায়। বলা হয়ে থাকে ঠান্ডা লাগলে, শরীরে ব্যথা-বেদনা হলে কালিজিরার তেল মালিশ করলে উপকার পাওয়া যায়। ছোটবেলায় সর্দিজ্বরে নাক বন্ধ হয়ে গেলে গুরুজনেরা পরিষ্কার ন্যাকড়াতে এক কী দুই চামচ কালিজিরা দিয়ে পুঁটলি বানিয়ে হাতে থেঁতলে নিয়ে নাকে চেপে শ্বাস টানতে বলতেন। তাতে সঙ্গে সঙ্গে নাক খুলে শ্বাস প্রশ্বাসে স্বস্তি আনত। এটি একটি ন্যাচারাল ইনহেলার।

বাংলাদেশে কালিজিরার ভর্তা খাওয়া এখন বেশ চোখে পড়ে। কালিজিরা সুপার ফুড হিসেবে খুব পাত্তা পাচ্ছে। এখন ভাবি, আমাদের মুরব্বিরা বহু আগেই এই খাদ্যবস্তুর উপকারিতা জেনেই ভাজি, নিরামিষে কালিজিরা ফোড়ন দিতে ভুলতেন না।

বিদেশ-বিভুঁইয়ে কালিজিরা, রসুন আর শুকনা মরিচ টেলে (রোস্ট) শিলপাটায় পিষে ভর্তা করা ঝামেলার কাজ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশে বুয়ারা বাটাবাটি, মসলা বা ভর্তা পেষার কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করে দেন বলেই সবাই আয়েশ করে খেতে পারেন। একদিন বুয়ারাও পাটার দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবেন আশা করছি। বিদেশে বুয়া নেই ঠিকই, তবে আছে ছোট্ট কফি গ্রাইন্ডার। শিলপাটা বা শিলনোরার কাজটা কফি গ্রাইন্ডার করে দিতে পারেন সহজেই।

বিদেশেও পরিষ্কার ভালো কালিজিরা পাওয়া যায়। সুপার মার্কেটে গার্লিক গ্রানুল (রসুনের পাতলা কুচি শুকিয়ে নিয়ে টালা) পাওয়া যায়। শুকনা মরিচ তো সবখানেই মেলে। চার কি পাঁচ চা-চামচ কালিজিরা, গার্লিক গ্রানুল এক চা-চামচ ও শুকনা মরিচ দুটো কি তিনটে। অল্প আঁচে পাত্র গরম করে এক-এক করে প্রথমে শুকনা মরিচ (কিচেন কাঁচি দিয়ে কেটে কেটে ছোট টুকরা করে নিতে হবে), তারপর কালিজিরা, সবশেষে গার্লিক গ্রানুল ছেড়ে সামান্য সময় নাড়াচাড়া করলেই মুচমুচে হয়ে যায়। ঠান্ডা হলে গ্রাইন্ডারে দিয়ে গুঁড়া করে নিলেই হবে। স্বাদমতো তাতে সামান্য লবণ মিশিয়ে কাচের কনটেইনারে রেখে দিলে বেশ কিছুদিন থাকে। খাওয়ার সময় গরম ভাতে এক বা চা- চামচ গুঁড়া নিয়ে তাতে ঘি বা সরষের তেল মিশিয়ে নিলেই হবে। ভেজিটেবল স্যুপ, চিকেন স্যুপেও এই সুপার ফুডের সামান্য গুঁড়া ছিটিয়ে নিলে স্বাদ বাড়ে। একদা গুরুজনের মুখে ও বর্তমানে ছাপার হরফে ঘোষিত কালিজিরার উপকারিতাও পাওয়া যাবে।

কালিজিরার নাম নাইজেলা সিড। তবে এটি অনিয়ন সিড নামেও পরিচিত। যদিও দেখতে অনিয়ন সিড বা পেঁয়াজবীজের মতো হলেও নাইজেলা সিড বা কালিজিরা সম্পূর্ণ আলাদা বা স্বতন্ত্র বস্তু। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, কালিজিরা থেকে ব্রেস্ট ও লাং ক্যানসার নিরাময়ের ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে বলে ভারতীয় পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে (সূত্র: বর্তমান, ৫ আগস্ট ২০১৯)। কালিজিরার গুণ বিচার করেই চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এখন তা মানব সমাজের বড়সড় উপকারে লাগাতে চেষ্টায় রত। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হজরত মুহম্মদ (সা.) বলেছেন, মৃত্যু ছাড়া সব রোগের ওষুধ রয়েছে কালিজিরাতে। আরও তথ্য হলো, মিসর সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রা বাথটাবে কালিজিরা দিয়ে স্নান করতেন সুস্থ ও সুন্দর থাকার জন্য। এত কিছুর পর কালিজিরাকে সুপার ফুড বলা যেতে পারে অবশ্যই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন