default-image

২৩ জুন ছিল স্যার গ্যাব্রিয়েল মানিক গমেজের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। জাপানে আমাদের ঘড়ির কাঁটা ঘুরে ২২ তারিখ পেরোলেই ফেসবুকে ভেসে এল গাব্রিয়েল মানিক গমেজের ছবি, স্মৃতিকথা, মন্তব্যসহ আরও কত কী। তিনি ছিলেন নটর ডেম কলেজে বাংলা বিভাগের শিক্ষক। বাংলাদেশের সেরা কলেজগুলোর মধ্যে এই নটর ডেম কলেজে যাঁরা পড়ার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই আশা করি এই গ্যাব্রিয়েল মানিক স্যারের ক্লাস পেয়েছেন। তাদের কোনোভাবেই স্যারকে ভোলার কথা নয়। অধ্যাপক গরিব নেওয়াজ, হামিদ স্যার এবং গাব্রিয়েল মানিক স্যারের কথা আশা করছি কেউ ভুলে যাননি। আমিও ভুলিনি।

১৯৮০–তে নাগরী সেন্ট নিকোলাস হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই পারিবারিকভাবে স্যারের সঙ্গে পরিচয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন বলেই তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। আমাদের বাসায় তিনি মাঝেমধ্যে আসতেন। আমিও যেতাম বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজে স্যারের বাসায়। এসএসসি পরীক্ষা লেখার আগে হোস্টেলে স্যারের বড় ছেলে জর্জ গমেজ আমরা একই সঙ্গে হোস্টেলে থাকার কারণে সম্পর্কটা পারিবারিকভাবে নিবিড় হয়েছিল।

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই দেখেছি, স্যার ক্লাসে এসে আমাকে আলাদা খাতিরযত্ন করতেন। ক্লাসের রুল নম্বর অনুযায়ী আমার সিট ছিল পেছন দিকে। কিন্তু তিনি ক্লাসে এসেই রুল কল করার পর প্রথমেই আমাকে ডেকে এনে সামনের সারির বেঞ্চে বসিয়ে এরপর পড়ানো শুরু করতেন। এটা ছিল যেন স্যারের নিয়মিত বিষয়। মাঝেমধ্যেই ক্লাসে পড়ানোর সময় বলে ফেলতেন, আমাকে তিনি অনেক ভালো জানেন। আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব সম্পর্ক। এমন আরও কিছু বলতেন, যে কারণে ক্লাসে আমার ঘনিষ্ঠ যারা ছিল, তারা আমাকে বিভিন্ন কথা বলে খ্যাপানোর চেষ্টা করত। আমার এই লেখায় সে বিষয়টি বলা ঠিক হবে না এই কারণে যে অনেকের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে যাবে, যা মোটেও শুভনীয় নয়।

নটর ডেম কলেজের সীমানায় স্যারকে দেখলে ছাত্রদের কেউ কেউ দূর থেকে টিস কাটার চেষ্টা করত। তাই আমাকে দেখলেই হতো, ডেকে কাছে নিয়ে বলতেন, খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মিশবে না কিন্তু। তুমি অনেক ভালো ছেলে। আমাদের বাসায় সব সময় তোমার কথা বলি। তা ছাড়া তোমার বড় ভাই বাসায় এলে তোমাকে নিয়ে কথা হয়। সেই বয়সে একটু আধটু যে দুষ্টুমি করতাম, সেই সুযোগটা যেন তিনি বন্ধ করে দিতেন আমার সম্পর্কে এভাবে প্রশংসা করে।

default-image

গাব্রিয়েল মানিক গমেজ নটর ডেম কলেজে পড়ানোর পাশাপাশি যতটা জানতাম ঢাকাস্থ আমেরিকান দূতাবাসের বিভিন্ন কর্মকর্তা যাঁরাই দেশে নতুন আসতেন, তাঁদের বাংলা শেখাতেন। এ কারণে তিনি দূতাবাসে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পার্টিতে যোগ দিতে সুযোগ পেতেন। যে কারণে পার্টিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে করা আলোচনার বিষয় তাঁর কাছ থেকে শোনা যেত। সব সময় না হলেও মাঝেমধ্যে আমাদের বাসায় এলে বড় ভাই বা অন্যদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা থেকে শোনা হতো অনেক কথা, যা সচরাচর কোনো মিডিয়ার সংবাদ হতো না অথচ সেসব বিষয় ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের দুজন মানুষকে চিনতাম যে দুজনকে, বঙ্গবন্ধু বলতে ছিলেন অন্ধ। তাদের সামনে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কেউ কোনো বাজে মন্তব্য তো দূরের কথা, কোনো ধরনের সমালোচনা পর্যন্ত করতে পারতেন না। আবার বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কেউ ভালো বললে, পারলে তাকে যেন সবকিছু উজাড় করে দিয়ে দেন খুশিতে। একজন ছিলেন আইনজীবী সিরিল শিকদার, আরেকজন ছিলেন এই অধ্যাপক গাব্রিয়েল মানিক। বড় ভাইয়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের কারণে আমি খুব কাছ থেকে তাঁদের সঙ্গে মেলামেশা করতে সুযোগ পেয়েছি। এই দুজনই ছিলেন বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থ কর্মী। আমার বিশ্বাস বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই দুজনের নাম জানেন এবং ব্যক্তিগতভাবেও চিনতেন।

আমি যতটা জানি, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ দেওয়ার আগে গাব্রিয়েল মানিক গমেজ বাইবেল পাঠ করেছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিষয়টি হয়তো কোথাও লেখা নেই। তবে গল্পের ছলে জেনেছি। আমাদের দেশের এমন অনেক ঘটনাই আছে, যা ইতিহাসে নেই। শুধু তা–ই নয়, গাব্রিয়েল মানিক স্যারের এমন অনেক কিছুরই ইতিহাস আছে, ইতিহাসে নেই। এ জন্য দুঃখ নেই।

স্যারকে আমার ভালো লাগার পেছনে একটি কারণ ছিল, যা তাঁকে কোনো দিন রাগ করতে দেখিনি। অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের লোক ছিলেন তিনি। সিলভার কালারের ফ্রেমের চশমা পরতেন। চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে সব সময় হেসে কথা বলতেন তিনি। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর অধ্যাপক গাব্রিয়েল মানিক গমেজকে আমি অনেক কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি সামাজিক সংগঠনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে সহজ–সরল ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সব সময় শুভকাজের সূচনা করতে। তাঁর মৃত্যুদিবসে তাঁর সব ভালো কাজের প্রশংসা ও আত্মার স্বর্গবাস কামনা করি।

গাব্রিয়েল মানিকের জন্ম ১৯৪২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালীর পাদ্রীশিবপুরে। ৩৩ বছর তিনি নটর ডেম কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি দ্য খ্রিষ্টান কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের সভাপতি, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, ন্যাশনাল ওয়াইএমসিএর সভাপতি, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কো–চেয়ারম্যানসহ আরও বিভিন্ন সামাজিক ও জাতীয় সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থেকে কাজ করেছেন।

*লেখক, জাপানপ্রবাসী

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0