'কত কাল দেখিনি তোমায়...'

বিজ্ঞাপন
default-image

গত বছরের শেষের দিকে প্রথম বিশ্ব মিডিয়ায় আলোচনা হয় চীনের উহানের করোনাভাইরাস নিয়ে। তখন আমি এবং আমার মতো অনেকেই ভাবিনি যে দুই-আড়াই মাসে আমাদেরও ঘরে, নিজের রুমে থাকতে হবে, তাও আবার স্বেচ্ছায়। ছোটবেলায় ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য কত মার, বকাঝকাই না সহ্য করতে হয়েছে! আর সময়ের কী নির্মম পরিহাস, আজ নিজের সচেতনতায় নিজেই নিজের রুমে নিজেকে আটকে রেখেছি। সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং করছি। মিনিমাম সাত ফুট দূরত্ব রেখে একে ওপরের সঙ্গে কথা বলছি। কিছু স্পর্শ করার আগে অনেকবার ভাবছি। সুপার শপ, শপিং মলগুলোয় গেলে প্রয়োজনের বাইরে একমুহূর্তও থাকছি না। কিন্তু এত কিছু যে করছি, স্বেচ্ছায়ই করছি, অথচ আমার বা যদি একটু বড় পরিসরে বলি, তাহলে আমাদের মন কোথায় পড়ে আছে, তার খবর নিয়েই আজকের এই লেখা।

প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যেতে অনুরোধ করা হয়েছে এখানকার কর্তৃপক্ষ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় আগেই বন্ধ হয়েছে তিন সপ্তাহের জন্য। তিন সপ্তাহ পরেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় বন্ধের মেয়াদ আরও বাড়িয়ে পুরো শিক্ষাবর্ষ করা হয়েছে। পড়াশোনা হবে নিজ গৃহ থেকে, যাকে বলা হয়েছে ‘distance education’। পাঁচ সপ্তাহ ধরে রুমেই আছি। এই পাঁচ সপ্তাহের প্রথম তিন সপ্তাহ শুধু প্রয়োজনীয় কিছু কাজে তিনবার বের হয়েছিলাম। এরপর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় আর বের হইনি।

এ দুর্যোগের সময়ে যেহেতু দিনের বড় অংশ একা থাকতে হয়, ভাবনার প্রচুর সময় পাওয়া যায়। বেশ কয়েক দিন ধরে শিশুকাল নিয়ে ভাবছি। যদিও ঝাপসা কিছু স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই মনে নেই।

মেয়েদের নাকি ছেলেদের থেকে ছোটবেলার স্মৃতি বেশি মনে থাকে, দাবি তোমার। সেই দাবির সত্যতা রক্ষার্থে মনে হয় অনেক সময় ধরে তুমি ছোটবেলার গল্প করো। যদিও ইন্টারনেটের এই যুগে কথা হয় তোমার সঙ্গে, মুখোমুখি বসে চা, সিগারেট হাতে দীর্ঘ আড্ডাগুলো বেশ মনে পড়ছে। গতকাল (১ এপ্রিল) রাতে একটা জিনিস খেয়াল করলাম। এখন আর এই ইন্টারনেটে আড্ডা দিতে ভালো লাগে না। বিরক্ত লাগে কথা বলতে। কৃত্রিম সবকিছুরই একটি টোল দিতে হয় মানুষের। আর এই টেকনোলজির যুগে boredom (একঘেয়েমিজিনত বিরক্তি বা ক্লান্তি) হচ্ছে আমাদের দেওয়া মূল্য। এখন আমরা খুব সহজেই bored হয়ে যাই। মেসেজ আসতে এক মিনিট দেরি হলেই আমরা বিরক্তিতে শব্দ করি মুখ দিয়ে। অথচ যত দূর মনে পড়ে চিঠির যুগে যখন একটা চিঠি যেতে এবং ওই চিঠির প্রত্যুত্তরে আরেকটা চিঠি পেতে সব মিলিয়ে এক মাস লেগে যেত। তখন কাউকে বিরক্তিতে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাতে দেখিনি বা মুখ দিয়ে শব্দ করতেও শুনিনি। অথচ তখন তো কত অনিশ্চয়তা ছিল। চিঠি গন্তব্যে পৌঁছিয়েছে কি না, তা–ও জানার সুযোগ ছিল না। কিন্তু মানুষজন আশাবাদী ছিল। অল্পতেই হতাশ হয়ে যেত না। কথাগুলো আমার নিজের জন্য বলা। নিজেকেই নিজে একটু উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করছি।

সময়ের কাঁটা সরছে না মোটেও। থেমে আছে সোয়া ১১টাতেই। এক ঘণ্টা পরে তাকিয়ে দেখি ১১টা ২০ মিনিট। চা আর সিগারেট আর একটা বই নিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যাবে কিছু সময় dorm-এর বাগানে। কিছু মানুষের নির্বুদ্ধিতার খেসারত দিতে হয় পুরো বিশ্বকে। Profit maximize করতে গিয়ে কখন যে জীবনের quality minimize হয়ে যাচ্ছে, তার দিকে নজর দেওয়ার সময় নেই অনেকের। আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত স্মৃতি নাড়া দিয়ে গেল। অবাক হলাম। কারণ ঘটনার সময়ে আমার মধ্যে তেমন কোনো তাড়ন অনুভব করিনি। ‘একটা নেহাতই স্বাভাবিক চিত্র’ বলে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলাম।

default-image

আমার বাসা থেকে পোস্তগোলা ব্রিজ হাঁটা দূরত্বে মাত্র ১৫ মিনিটের পথ। প্রতিদিন বিকেলে আগে হাঁটতে যেতাম ব্রিজের ওপরে। তো সন্ধ্যা হয়ে এলেই ব্রিজের পাশের ফুটপাতে কিছু ছোট ছেলেপেলে এসে শুয়ে পড়ত আর ‘ড্যান্ডি’ টানত। জুতোর আঠা যেহেতু প্রধান উপকরণ, তাই বেশ সহজলভ্য ছিল। হঠাৎ আজ সন্ধ্যায়, যখন বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি অনিয়মিত বৃষ্টি পড়ছে, তখন ওই ‘ড্যান্ডি’ টানা ছেলেমেয়েগুলোর কথা মনে পড়ল। একবার ওদের একজনের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গিয়েছিল। পরে অজানা এক লজ্জায় সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলাম। আশা করি ওরা সবাই ভালো আছে। এই দুর্যোগের মুহূর্তে ওদের কেউ দায়িত্ব নেওয়ার আছে কি না জানি না। আশা করি কোনো নিরাপদ কোলে ওরা নিরাপদ আছে।

আজ এই বদ্ধ সময়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা উপভোগ করতে ইচ্ছে করছে, তাও আবার তোমার হাত ধরে। তোমার হাত দুটোও খুব মনে পড়ছে। কবির ভাষায়, ‘হৃদয়ের গাঢ় পঙ্‌ক্তি লেখা’ দুটো হাত। মোড়ের চায়ের দোকানটা কি এখনো খোলা কি না আর একবার বারান্দা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে। সব স্মৃতিগুলো এখন আরেকবার মনে করছি এবং সব স্মৃতিগুলোই মূল্যবান মনে হচ্ছে। আশা করি সবাই, পরিবার, বন্ধু, ক্লাসের সহপাঠীরা, বাসের ভিড়ে চোখ পড়া কোনো এক তরুণী, লেকের পাড়ে বসে আড্ডা দেওয়া বন্ধুরা, পুরো দেশবাসী সবাই নিরাপদে এবং সুস্থ আছেন। শিগগিরই এই অবস্থা শেষ হবে এবং আবার কোনো এক বিকেলে, সূর্য অস্ত যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, আমরা ফিরে আসব আমাদের মাঝে। ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত, সবাই ভালো থাকুক, এই প্রত্যাশা।

*লেখক: শিক্ষার্থী, ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্তাম্বুল, তুরস্ক। saifuddin1558@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন