রাজীবের নীরব অভিমান

সড়ক দুর্ঘটনায় একটি হাত হারিয়েছেন রাজীব হোসেন। প্রথম আলো ফাইল ছবি
সড়ক দুর্ঘটনায় একটি হাত হারিয়েছেন রাজীব হোসেন। প্রথম আলো ফাইল ছবি
>
  • সড়ক দুর্ঘটনায় হাত হারিয়েছেন রাজীব। 
  • রাজীব প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খেয়েছেন।

রাজীবের রাগ-ঝগড়া-বোঝাপড়াটা কার সঙ্গে, কেউ জানে না। কারও সঙ্গে কথা বলছেন না তিনি। চোখ খুলছেন না। মুখের কাছে খাবার নিলে ঠোঁট চেপে রাখছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের ডাকে একবার শুধু বলেছেন, ‘রাজীব কে? রাজীব মরে গেছে।’

সড়ক দুর্ঘটনায় হাত হারানো রাজীব হোসেন কেমন আছেন? জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক অসিত চন্দ্র সরকার গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজীবের মাথার খুলির হাড় ভেঙে গেছে, ফুলেও আছে কিছুটা। সেখান থেকে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারত। কিন্তু শারীরিক অবস্থার উন্নতিই হয়েছে বলব। এখন রাজীব শুধু রেগে যাচ্ছে। ওর হাতটা নেই, এখন বুঝতে পারছে।’

রাজীব তাঁর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা না বললেও চিকিৎসকদের কথার টুকটাক উত্তর দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি। তবে চোখ খোলেন না। খেতে চান না। নাকে নল ঢোকানোর সময় বাধা দিয়েছেন। নল সরিয়ে নিতে বলেছেন রাজীব। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও রাজীব প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খেয়েছেন। তিনি বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন।

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সামনে গতকালও দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজীবের খালা জাহানারা বেগম। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার আগ পর্যন্ত এই খালার কাছেই থাকতেন তিনি। রাজীবের মনের অবস্থা তিনিই সবচেয়ে ভালো বোঝেন বলে জানালেন। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত যুদ্ধ করে একটু একটু করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন যে রাজীব, তাঁর ভবিষ্যৎ চিন্তায় কাতর জাহানারা। তাঁর ভাগনে এই জীবনে নিজেকে কীভাবে খাপ খাইয়ে নেবেন, তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না।

রাজীব দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর মা আকলিমা বেগম মারা যান। বাবা অপসোনিন ফার্মার ট্যাবলেট সেকশনে কাজ করতেন। প্রাচুর্য না থাকলেও সচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিলেন। রাজীব বড়, পরে আরও দুটি ভাই। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। নিখোঁজ ছিলেন অনেক দিন। পরে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। রাজীব তখন তাঁর নানির বাড়িতে আশ্রয় নেন। নানি মারা গেলে খালা জাহানারা বেগম রাজীবের দায়িত্ব নেন। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর রাজীব গৃহশিক্ষকতা শুরু করেন, কম্পিউটারের কাজ শেখেন। যাত্রাবাড়ীর একটি মেসে থাকতেন।

জাহানারা বলছিলেন, ঘটনার আগের দিন মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনিতে তাঁর বাসায় গিয়েছিলেন রাজীব। তিনি রাজীবকে চাকরি-বাকরিতে ঢুকে একটা বিয়ে করে থিতু হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাহলে রাজীবের ছোট ভাই দুটোকেও আর এতিমখানায় থাকতে হয় না। রাজীব বলেছিলেন, তিনি অনেকটাই গুছিয়ে এনেছেন। অল্প কটা দিন পরই সমস্যার সমাধান হবে।

মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন গত মঙ্গলবার বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়ে যাত্রাবাড়ী থেকে ফিরছিলেন। দুই বাসের চাপে রাজীবের একটি হাত শরীর থেকে ছিঁড়ে যায়।