খুলনা সিটি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের জমজমাট প্রচার

উত্তাপ-উৎকণ্ঠা ছাপিয়ে কাল ছুটির দিনে জমজমাট প্রচারণায় ব্যস্ত হয়ে ওঠেন খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব মেয়র প্রার্থী। পুলিশের ধরপাকড় ও বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশির অভিযোগকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীর মুখে গতকাল শুক্রবারও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ছিল। তবে ভোটারদের উৎসাহের কারণে প্রচারণায় এর বিরূপ প্রভাব পড়েনি।
১৫ মের এই নির্বাচনে মেয়র পদে লড়ছেন পাঁচজন। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুজন আওয়ামী লীগের তালুকদার আবদুল খালেক ও বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু। আওয়ামী লীগের প্রার্থী সকাল সাড়ে সাতটায় দৌলতপুর মহসিন মোড় থেকে গণসংযোগ শুরু করেন। বিএনপির প্রার্থী শুরু করেন সকাল সাড়ে আটটায় বাগমারা এলাকা থেকে। উভয় প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও দলে দলে ভাগ হয়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। গণসংযোগে অসংখ্য নারী কর্মীর অংশগ্রহণ লক্ষণীয়।
নির্বাচনপ্রক্রিয়ার শুরুতে দুই প্রার্থী পরস্পরের বিরুদ্ধে হলফনামায় সত্য গোপন ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনতে শুরু করেন। এরপর কিছুদিন শান্ত থাকার পর দুই প্রার্থী ও সমর্থকদের কথার লড়াই উত্তাপ ছড়াতে থাকে। গত বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলামের নির্বাচনী গণসংযোগে হামলায় সাতজন আহত হয় বলে অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী লীগের দাবি, বিএনপির লোকজনই তাদের দলের একজন কর্মীর হাত ভেঙে দিয়েছে। একই দিন পুলিশের ধরপাকড়ের প্রতিবাদে বিএনপির প্রার্থী প্রচারণা কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত করে দেন। তিনি বলেন, শত অত্যাচারের মধ্যেও তাঁরা নির্বাচন থেকে সরে যাবেন না।
তালুকদার খালেকের গণসংযোগ
কাল সকালে দৌলতপুর ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক। দৌলতপুর কাঁচাবাজার, পাইকারি বাজার, মাছবাজার, রেললাইনসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগকালে তিনি বলেন, দৌলতপুর বাজারটি অনেক পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও তেমন উন্নয়ন হয়নি। এবার তিনি মেয়র হলে বাজারের ব্যবসায়ীদের পরামর্শ নিয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। দুপুরে তিনি নগরের শীতলাবাড়ি মন্দিরে মতবিনিময়, বিকেলে খালিশপুরে মতবিনিময়, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের অবশিষ্ট অংশ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন। মতবিনিময়কালে তালুকদার খালেক বলেন, সিটি করপোরেশনের বয়সের অধিকাংশ সময়জুড়ে বিএনপির মেয়র থাকলেও নগরের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। যা কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন তাঁর দায়িত্বে থাকাকালে হয়েছে। বিএনপি পরাজয়ের ভয়ে এখন নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে।
গণসংযোগকালে তালুকদার খালেকের সঙ্গে ছিলেন মহানগর জাসদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম, নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক নূর ইসলাম বন্দ, দৌলতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ সৈয়দ আলী, দৌলতপুর থানা সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহীন জামাল পন, দৌলতপুর বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ আসলাম, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফারুক হাসান প্রমুখ।

নজরুল ইসলামের গণসংযোগ
বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম গতকাল সকালে নগরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাগমারা ব্রিজ, মিস্ত্রিপাড়া বাজারসহ সংলগ্ন এলাকায় গণসংযোগ, প্রচারপত্র বিতরণ ও জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তিনি বলেন, নাগরিকদের ইচ্ছায় সিটি করপোরেশন পরিচালিত হবে। নাগরিক শাসনভিত্তিক জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে তিনি নগরবাসীর সমর্থন ও রায় প্রত্যাশা করেন।
নজরুল ইসলাম বলেন, নগরে ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হওয়ায় শাসক দলের মনে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। নিশ্চিত পরাজয় জেনে তাঁরা যেনতেন উপায়ে নৌকা মার্কাকে ভোটে জেতাতে চান। পুলিশ ও দলীয় ক্যাডারদের লেলিয়ে দিয়ে ধানের শীষের কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। অভিযান চালিয়ে নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও বাড়ি ছাড়া করা হচ্ছে। হামলায় আহত করে আবার মিথ্যা মামলার আসামিও করা হচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্য করা হচ্ছে নৌকার পক্ষে কাজ করতে। এরপরও যেকোনো পরিস্থিতিতে বিএনপি মাঠ ছাড়বে না বলে ঘোষণা দেন তিনি।
গণসংযোগকালে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে ছিলেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসেন, বিএনপি নেতা ওহেদুজ্জামান, সাবেক সাংসদ কাজী আলাউদ্দিন আলী, বিজেপির নগর সভাপতি লতিফুর রহমান, জেপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা, খেলাফত মজলিসের নগর সাধারণ সম্পাদক মাওলানা নাসিরউদ্দিন, বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজউদ্দিন, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি শাহ আলম প্রমুখ।
একইভাবে অন্য তিন মেয়র প্রার্থী জাতীয় পার্টির শফিকুর রহমান মুশফিক, সিপিবির মিজানুর রহমান ও ইসলামী আন্দোলনের মুজাম্মিল হকও নিজ নিজ কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
নারী কর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ
গতকাল দুপুর ১২টা ২০ মিনিট। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর কালো মেঘে ঢাকা খুলনার আকাশ। বৃষ্টি উপেক্ষা করে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের লোহার গেট এলাকায় ১০ থেকে ১২ জন নারী দোকানির কাছে বিএনপির প্রচারপত্র বিতরণ করছেন। বৃষ্টি আরও একটু জেঁকে এলেও ছোট ছোট দলে আরও নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকল। বিভিন্ন বয়সের নারীরা দল বেঁধে একটি বাড়ির মধ্যে ঢুকলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রায় দেড় শ নারী বাড়িটাতে জড়ো হয়ে গেলেন। জানা গেল, ওই বাড়ি থেকেই ওই ওয়ার্ডে বিএনপির নির্বাচনী কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।