ধারের টাকায় আর নির্বাচন নয়

মো. আবু জাহির
মো. আবু জাহির

২০০৮ ও ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় খরচ জোগাতে টাকা ধার করতে হয়েছিল মো. আবু জাহিরের। তবে এবার আর ওই পথে পা বাড়াতে হচ্ছে না হবিগঞ্জ-৩ আসনের এই সাংসদের। এই ১০ বছরে তাঁর আয় বেড়েছে ১৮ গুণ। সম্পদ বেড়েছে সাত গুণ। তাই নিজের টাকা দিয়েই এবার নির্বাচন করবেন তিনি।

হবিগঞ্জ সদর, লাখাই ও শায়েস্তাগঞ্জ নিয়ে হবিগঞ্জ-৩ আসন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে প্রথমবারের মতো সাংসদ হন আবু জাহির। হলফনামা ঘেঁটে দেখা যায়, ওই সময়ে আবু জাহিরের বার্ষিক আয় ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৯০ টাকা। এর মধ্যে কৃষি থেকে আয় ১০ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া, অ্যাপার্টমেন্ট ও দোকানভাড়া থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৯০ টাকা। আইন পেশা থেকে আয় ১ লাখ টাকা। ওই সময়ে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ ছিল ৫৮ লাখ ৪০ হাজার ২৫০ টাকা। ব্যাংকে জমা ছিল মাত্র ২১ হাজার ১৫৩ টাকা। সেভিংস, সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে বা স্থায়ী আমানতে ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৩৪৫ টাকা। বাস, ট্রাক, মোটর গাড়ি ও মোটরসাইকেল ইত্যাদি ছিল ১৫ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫২ টাকার। ২৬ ভরি স্বর্ণ ছিল ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকার। আসবাব ২৫ হাজার টাকা। কৃষিজমি ৪০ হাজার টাকা। অকৃষিজমি ৯৫ হাজার ৫০০ টাকার। দালান (আবাসিক/বাণিজ্যিক) ছিল ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকার। নির্বাচনের খরচ জোগাতে আবু জাহির তখন সেলিম মিয়া ও মনিরুজ্জামান নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।

সাংসদ আবু জাহির ২০১৪ সালে যখন নির্বাচন করেন তখনো অতটা ‘ধনী’ হয়ে উঠতে পারেননি। এ কারণে সেবারও নির্বাচন করতে আবদুর রহমান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা ধার করতে হয়েছিল। ওই সময়ে দেওয়া হলফনামায় তিনি সেটা উল্লেখ করেছেন। হলফনামা বলছে, তখন সাংসদের বার্ষিক আয় ছিল ১৮ লাখ ১৩ হাজার ৫৩৮ টাকা। তার মধ্যে কৃষি খাতে ছিল ১৫ হাজার টাকা। বাড়ি ও দোকান ভাড়া ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার। শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানতের মুনাফা হিসেবে পেতেন ৩২ হাজার ৫৮৮ টাকা। আইন পেশা থেকে আয় করতেন ২ লাখ টাকা। সংসদ সদস্য হিসেবে পারিতোষিক ছিল ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ৯৫০ টাকা।

তখন সাংসদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫৪ লাখ ১ হাজার ৬৮ টাকা। হাতে নগদ টাকা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা মিলিয়ে ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩১২ টাকা। বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র বা স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ ছিল ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪০ টাকা। বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ছিল ৫৭ লাখ ২৮ হাজার ৪৬৬ টাকার। ২৬ ভরি স্বর্ণ ছিল ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকার। আসবাব ছিল ২৫ হাজার টাকার। একটি পিস্তল, একটি শটগান, একটি মুঠোফোন সেট ও টিঅ্যান্ডটি ফোন ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৫০ টাকার। আরও ছিল ৪০ হাজার টাকার কৃষিজমি। বাড়ি, বাসা, দোকান ও ঢাকায় প্লট ছিল ৪৬ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকার। দালান (আবাসিক/বাণিজ্যিক) ছিল ২৭ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকার।

তবে সাংসদের সম্পদ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে গত পাঁচ বছরে। হলফনামা অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে ৪ কোটি ২৬ লাখ ৮৮ হাজার ৪০৯ টাকার মালিক। অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধানে তাঁর সম্পদ বেড়ে হয়েছে সাত গুণ। বর্তমানে সংসদের হাতে নগদ ও ব্যাংকে জমা মিলিয়ে আছে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৩৮৯ টাকা। বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র বা স্থায়ী আমানত আছে ৩৭ লাখ ৬৪ হাজার ৯৩৫ টাকার। ১ কোটি ৯ লাখ ২৮ হাজার ৪ টাকা মূল্যের দুটি জিপ গাড়ি আছে। আছে ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকার মূল্যের ২৫ ভরি স্বর্ণ। আসবাব আছে ২৫ হাজার টাকার। নিজের নামে কৃষিজমি আছে ৪২ লাখ ৯৯ হাজার টাকার। বাড়ি, বাসা, দোকান ও ঢাকায় প্লট ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের। এ ছাড়া দালান (আবাসিক/বাণিজ্যিক) আছে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৩ টাকার। 

এর বাইরে সাংসদ আবু জাহিরের স্ত্রী আলেয়া বেগমের নামেও বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। গত বুধবার প্রথম আলোয় ‘দুই সাংসদদের চেয়ে স্ত্রী ধনী’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে তার বিশদ বর্ণনা আছে।

আর বর্তমানে সাংসদ আবু জাহিরের বার্ষিক আয় ৩৭ লাখ ৭ হাজার ৯২৬ টাকা। এর মধ্যে বাড়ি ও দোকানভাড়া থেকে পান ৪ লাখ ১১ হাজার ৯০০ টাকা। কৃষি খাতে আয় ৩০ হাজার টাকা। আইন পেশা থেকে পান ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সংসদ সদস্য হিসেবে পারিতোষিক ও ভাতা ১৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকা। বিবিধ খাত থেকে পান ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। হলফনামায় সাংসদ জাহির বলেছেন, বর্তমানে তাঁর কোনো ধারদেনা নেই। আয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, সাংসদের বার্ষিক আয় গত ১০ বছরে প্রায় ১৮ গুণ বেড়েছে।

সাংসদ মো. আবু জাহির প্রথম আলোকে বলেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিকেরই আয় বেড়েছে। সেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাঁরও আয় ও সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। এসব সম্পদের নিয়মিত কর তিনি দিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, সম্পদ বাড়া দোষের কিছু নয়। দেখতে হবে, এখানে অস্বাভাবিক কিছু বেড়েছে কি না।

সাংসদ আবু জাহির ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি বর্তমানে হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে আছেন। তিনি টানা দুবারের সাংসদ। এবার মনোনয়ন পাওয়ার আগে তাঁকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ছিল এলাকায়। গুঞ্জন ছড়িয়েছিল, এবার তিনি মনোনয়ন পাচ্ছেন না। তবে সব আলোচনা-সমালোচনা ডিঙিয়ে তিনি তৃতীয়বারের মতো দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন।