লাশ জিম্মি করে গাড়ি ব্যবসা
>• রাজশাহী মেডিকেল কলেজ
• হাসপাতালটিতে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ জন রোগী মারা যায়
• কোনো রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি চক্রের লোকজন খবর পেয়ে ছুটে আসে
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের লাশ জিম্মি করে একটি চক্র দীর্ঘদিন যাবৎ ভাড়া গাড়ির ব্যবসা করছে। এরা এতই প্রভাবশালী যে হাসপাতালে কোনো রোগীর মৃত্যু হলে এই চক্রের গাড়ি এবং তাদের চাওয়া দামের কমে অন্য কোনো গাড়িতে লাশ তোলা যায় না। এমনকি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও যেন এ চক্রের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৮০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি থাকে। এদের মধ্যে অধিকাংশ রোগীই জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত থাকে অথবা গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় ভর্তি থাকে। ফলে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ জন রোগী মারা যায়। কোনো রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি চক্রের লোকজন খবর পেয়ে যান। যে ওয়ার্ড বা কেবিনে রোগী মারা গেছে, চক্রটির লোকজন সেখানে গিয়ে হাজির হন। হাসপাতাল থেকে লাশ বের করে নিয়ে আসা পর্যন্ত তাঁরা ওই লাশের সঙ্গে লেগেই থাকেন। এরপর কোন গাড়িতে লাশ তোলা হবে, কত ভাড়া দিতে হবে, তা একজন গাড়ির মালিক উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে সেটিই স্থায়ী হয়ে যায়। আর কেউ ওই ভাড়ার কম চাইবেন না। অন্য কেউ লাশও গাড়িতে তুলবেন না। এমনকি এই চক্রের বাইরের কোনো গাড়ি নিয়ে এলেও লাশ সে গাড়িতে তুলতে দেওয়া হয় না।
গত ১০ জানুয়ারি রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী মিঠন সরদারের চাচা মারা যান। তাঁর বাড়ি জেলার দুর্গাপুর উপজেলায়। হাসপাতাল থেকে বাড়ির দূরত্ব প্রায় ২৭ কিলোমিটার। মিঠন হাসপাতাল থেকে চাচার লাশ নিয়ে যেতে এই চক্রের হাতে পড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন।
মিঠন বলেন, লাশের সঙ্গে থাকা তাঁরা কয়েকজন একটি গাড়িতে লাশ তুলেছিলেন। কিন্তু তাঁদের বাধ্য করা হয় সেই গাড়ি থেকে লাশ নামিয়ে ওই চক্রের গাড়িতে তুলতে।
মিঠন সরদার বলেন, ‘শুধু তা–ই নয়, তারা এসে বিভিন্ন বিষয়ে জেরা করতে করতে আমাদের নাজেহাল করে ফেলেন। এই চক্রের সদস্যরা আমাদের সঙ্গে এত দুর্ব্যবহার করেন যে তখন চাচা মারা যাওয়ার দুঃখ ভুলে কীভাবে এই বিপদ থেকে রেহাই পাব, তা নিয়েই দিশেহারা হয়ে পড়ি।’ শেষে মাত্র ২৭ কিলোমিটার রাস্তার জন্য ৪ হাজার ৩০০ টাকা ভাড়ায় লাশটি বহনের জন্য চক্রটির সঙ্গে রফা হয় মিঠনের পরিবারের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের সামনে অবস্থানকারী এ চক্র রোগী ও লাশ পরিবহনের জন্য অন্যায়ভাবে যাতে বাড়তি টাকা আদায় করতে না পারে, এ জন্য ভাড়া নির্ধারণ করে দিতে গত বছরের ১২ আগস্ট হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিলুর রহমান রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেন।
সূত্রটি জানায়, দালাল ও বহিরাগত অ্যাম্বুলেন্সের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণসহ ১২ দফা নিয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি সভা হয়েছে। এতে উপস্থিত ছিলেন নগরের রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান। তিনি জানান, তিনি সভায় বহিরাগত অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ৩০ টাকা কিলোমিটার হিসাবে ভাড়া নির্ধারণের প্রস্তাব করেছেন। নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা নোটিশ আকারে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে টাঙিয়ে দেওয়া হলে লাশ টানা গাড়ি চক্রের লোকজন আর রোগীর স্বজনদের হয়রানি করতে পারবেন না।
জেলা প্রশাসক এস এম আবদুল কাদের বলেন, একটি সক্রিয় সিন্ডিকেট এ কাজ করে থাকে। ১০ ফেব্রুয়ারি জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি উঠেছিল। সেখানে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। শিগগিরই সেটা বাস্তবায়ন করা হবে।