মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে পারছেন না জেলেরা

বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার উপকূলে জলদস্যুরা আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দস্যুরা জেলেদের আহরিত ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ ও জাল লুট করছে। ক্ষেত্র বিশেষে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য লুট করছে জেলেসহ মাছ ধরার ট্রলার।

গত রোববার এক দিনে একাধিক দস্যু বাহিনী মুক্তিপণ আদায়ের জন্য ১৪টি ট্রলারসহ ৫৭ জেলেকে অপহরণ করেছে। জলদস্যু আতঙ্কে জেলেরা মাছ ধরতে পারছেন না। মাছ নিয়ে ঘাটে ফেরার সময় দস্যুদের কবলে পড়ছেন।

কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসাইন বলেন, সাগরে দস্যুতা বন্ধ না হলে ছয় হাজার ট্রলারের মাছ ধরা বন্ধ হবে। তখন মাছের সংকট দেখা দিতে পারে।

উপকূলরক্ষী বাহিনী টেকনাফের স্টেশন কমান্ডার লে. (বিএন) ফয়জুল ইসলাম মন্ডল প্রথম আলোকে বলেন, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার উপকূলে কিছু ট্রলারে জলদস্যুদের লুটপাটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে মালিক পক্ষের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কোস্টগার্ড টহল জোরদার করেছে। অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

রোববার ভোরে গভীর সাগর থেকে ইলিশ নিয়ে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছড়া ফিশারিঘাটে ফেরার পথে মহেশখালীর সোনাদিয়া উপকূলে দস্যুদের কবলে পড়ে একটি ট্রলার। ট্রলারের মালিক শহরের নুনিয়াছড়ার বাসিন্দা ওসমান গণি বলেন, গতকাল সোমবার বিকেল পর্যন্ত ট্রলারটির সন্ধান মেলেনি। ট্রলারে জেলে ছিল ২৬ জন। মুক্তিপণ আদায়ের জন্য জেলেসহ ট্রলারটি অপহরণ করা হয়েছে।

একই দিন জলদস্যুদের কবলে পড়ে মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের বেলাল উদ্দিনের একটি ট্রলার। দস্যুরা ট্রলারের ১৮ জেলেকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আহরিত কয়েক লাখ টাকার মাছ ও জাল লুট করে। এ সময় দস্যুদের বেদম পিটুনিতে চার জেলে গুরুতর আহত হন। পরে অন্য একটি ট্রলার আহত জেলেদের উদ্ধার করে মহেশখালীতে নিয়ে আসেন।

ট্রলারের মালিক বেলাল উদ্দিন বলেন, সেন্ট মার্টিন থেকে টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী হয়ে কুতুবদিয়া পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার উপকূলে একাধিক জলদস্যু বাহিনীর তাণ্ডব চলছে। নৌ ও কোস্টগার্ড বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করে দস্যুরা তাণ্ডব চালাচ্ছে। দস্যুদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় জেলেরা প্রতিরোধ করতে পারছেন না।

ফিশিং বোট মালিক সমিতি সূত্র জানায়, রোববার দস্যুতার শিকার ১৪টি নৌযানের মধ্যে কক্সবাজারের আবু সোলতান প্রকাশ নাগু কোম্পানির মালিকানাধীন ২টি, নুনিয়াছড়ার মোজাম্মেল হকের ১টি, একই এলাকার সোহেল আহমদের ১টি, নতুন বাহারছড়ার ওসমান গনির ২টি, শহরের এন্ডারসন রোডের কাইয়ূম সওদাগরের ২টি, চট্টগ্রামের ৪টি ও বরগুনার পাথরঘাটার ২টি ট্রলার রয়েছে।

অধিকাংশ ট্রলারের ৪-৬ জন জেলে শ্রমিককে আটকে রাখা হয়েছে। অন্যদের মুক্তিপণের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। আগের দিন শনিবারও একই উপকূলে ৩০টি ট্রলারে লুটপাট চালিয়েছে দস্যুরা।

নুনিয়াছড়ার ট্রলার মালিক ও কক্সবাজার ফিশারিঘাট মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, গত পাঁচ দিনে মহেশখালীর সোনাদিয়া, ধলঘাটা, কুতুবদিয়া ও টেকনাফ উপকূলে একাধিক জলদস্যু বাহিনী শতাধিক ট্রলারে লুটপাট চালিয়েছে। এ সময় অন্তত ৫০-৬০ জন জেলেসহ ৩৪টি ট্রলার অপহরণ করে কোটি টাকার মুক্তিপণ আদায় করেছে দস্যুরা। মুক্তিপণ আদায় করতেই দস্যুরা জেলেদের অপহরণ করেছে।

গত বছরের ২০ নভেম্বর মহেশখালীর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের হাতে ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৭ হাজার ৬৩৭টি গোলাবারুদ জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার ছয় বাহিনীর ৪৩ জলদস্যু। তাঁরা এখন কক্সবাজার কারাগারে বন্দীজীবন কাটাচ্ছেন। এরপর কিছুদিন সাগরে জেলেরা নির্বিঘ্নে মাছ ধরেছে। কিন্তু সম্প্রতি জলদস্যুদের তৎপরতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আত্মসমর্পণ না করা আরও ছয়টি বাহিনীর চার শতাধিক দস্যু উপকূলে তাণ্ডব চালাচ্ছে।

জলদস্যুদের অপতৎপরতা বন্ধের দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে শহরের ফিশারিঘাটে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে কক্সবাজার ফিশারিঘাট মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতি। সমিতির সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য দেন, সাধারণ সম্পাদক মনির উদ্দিন, ফিশারীঘাট মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সভাপতি ওসমান গণি, যুগ্ম সম্পাদক হেলাল উদ্দিন ও মো. ছিদ্দিক।

এ ব্যাপারে মহেশখালী থানার ওসি প্রভাষ চন্দ্র ধর বলেন, সম্প্রতি উপকূলে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ১১ অস্ত্রসহ ২০ জন দস্যুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধে মহেশখালীতে নিহত হয়েছে দুজন জলদস্যু। কিন্তু গভীর সাগরে গিয়ে জলদস্যুদের গ্রেপ্তার করার মতো আধুনিক জলযান পুলিশের নেই। উপকূলে দস্যুদের গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।