বিভিন্ন ভবনে রাসায়নিকের গুদাম, আতঙ্কে স্থানীয়রা

টানবাজারের এস এম মালেহ রোডে রাসায়নিকের দোকানের ওপর বসতঘর।
টানবাজারের এস এম মালেহ রোডে রাসায়নিকের দোকানের ওপর বসতঘর।

নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজারে বিভিন্ন ভবনের ভূগর্ভে ও নিচতলায় রাসায়নিক, সুতা, তুলার গুদাম গড়ে তোলা হয়েছে। এসব গুদামের ওপরের তলায় বসবাস করছে হাজারো মানুষ। সরু গলির ওই এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে রাজধানীর নিমতলী ও চকবাজারের মতো প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে স্থানীয় লোকজনের। তাঁরা দ্রুত এসব গুদাম সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, এসব ভবন ও আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের গুদাম খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

গত শনিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরের টানবাজার, নিমতলীসহ আশপাশের এলাকায় সুতা, তুলা, রঙের বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিকের পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র। এসব এলাকার বিভিন্ন ভবনের ভূগর্ভস্থ তলা ও নিচের তলায় সুতা, তুলা ও রাসায়নিকের গুদাম করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। রাসায়নিকের মধ্যে রয়েছে নাইট্রিক অ্যাসিড, সালফিউরিক অ্যাসিড, থিনার, পাওয়ার সিলিকনসহ বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য। এসব ভবনের গুদামের ওপরের তলাগুলোতে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে হাজারো মানুষ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গুদাম থেকে এসব মালামাল সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে।

এলাকাবাসী জানিয়েছেন, বছরের পর বছর বহুতল ভবনের ভূগর্ভস্থ তলা ও নিচতলার গুদামে রাসায়নিক, সুতা, তুলা মজুত করে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকায় অগ্নিকাণ্ড হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বাড়িভাড়ার চেয়ে গুদামভাড়া বেশি হওয়ায় অধিকাংশ বাড়ির মালিক ভূগর্ভস্থ ও নিচের তলায় গুদাম ভাড়া দিয়েছেন। চকবাজারের ঘটনার পর থেকে এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন বলেন, আবাসিক ভবনের নিচতলা ও ভূগর্ভস্থ তলায় রাসায়নিকের অনেক গুদাম রয়েছে। এগুলো থেকে যেকোনো সময় নিমতলী ও চকবাজারের মতো ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।

টানবাজার এলাকার বাসিন্দা হৃদয় দেওয়ান বলেন, টানবাজারে বেশ কয়েকবার আগুন লেগেছে। সরু রাস্তা ও গলির কারণে আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে বেগ পেতে হয়েছে। এখানে রাসায়নিকের গুদামে আগুন লাগলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

টানবাজার সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুমন সাহা বলেন, নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে জনবসতিহীন এলাকায় নেওয়ার জন্য তৎকালীন জেলা প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস বলেন, ‘টানবাজারের কিছু আবাসিক ভবনের ভূগর্ভস্থ ও নিচতলায় রাসায়নিক ও সুতার গুদাম রয়েছে। এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি গুদাম ভাড়া দেওয়া ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, চকবাজারের মতো নারায়ণগঞ্জেও বহুতল ভবনের ভূগর্ভস্থ ও নিচতলায় রঙের রাসায়নিক ও সুতার গুদাম রয়েছে। অনেক রাসায়নিক রয়েছে, যা আগুনের সংস্পর্শে এলে মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগলে সুতার সিনথেটিক বস্তুতে কালো ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অধিকাংশ বহুতল ভবনের কোনো ছাড়পত্র নেই। তিনি বলেন, ‘ওই এলাকার রাস্তা সরু থাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে পানির উৎস নেই। আগুন লাগলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকি এড়াতে আমরা প্রতিটি ভবনের মালিককে ভবনের ভূগর্ভস্থ ও নিচের তলায় ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যালের গুদাম সরিয়ে ফেলতে চিঠি দেব।’

এ বিষয়ে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ টেক্সটাইল, ডাইজ অ্যান্ড কেমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিটন সাহা বলেন, ‘বহুতল ভবনের গুদামগুলো একটি থেকে আরেকটি নিরাপদ দূরত্বে রয়েছে। আমরা নিমতলী ও চকবাজার থেকে শিক্ষা নিয়েছি। আবাসিক এলাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়া বলেন, চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে জেলার যেসব আবাসিক এলাকায় কেমিক্যালের গুদাম রয়েছে, সেগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। নিরাপদ স্থানের বাইরে এসব ঝুঁকিপূর্ণ গুদামে কোনো রাসায়নিকের মজুত রাখা যাবে না। এ লক্ষ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হচ্ছে।