ইটভাটার কারনে মরে যাচ্ছে ধানগাছ

>

নোয়াখালীর সেনবাগে ইটভাটার আশপাশের খেতে মরে যাচ্ছে ধানগাছ। গত রোববার ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রামে।  প্রথম আলো
নোয়াখালীর সেনবাগে ইটভাটার আশপাশের খেতে মরে যাচ্ছে ধানগাছ। গত রোববার ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রামে। প্রথম আলো

প্রায় আট বছর আগে বিরাহিমপুরে ইটভাটা দুটি গড়ে ওঠে। এরপর থেকে প্রতিবছর ফসল নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছে।

ফসলি জমির সঙ্গে লাগোয়া পাশাপাশি দুটি ইটভাটা। দিন-রাত সমানে পুড়ছে ইট। ধোঁয়ার আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে চারপাশ। এর প্রভাব পড়েছে এখন ধানখেতে। রোগবালাই ছাড়াই মরে যাচ্ছে সদ্য রোপণ করা ধানগাছ। অথচ জমিতে পর্যাপ্ত সেচও রয়েছে।

এ চিত্র নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের বিরাহিমপুর এলাকায়। এক সপ্তাহ ধরে ধানগাছের এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ওই এলাকার কৃষকেরা। তাঁরা বিষয়টি কৃষি বিভাগে জানিয়েছেন। তবে ইটভাটার মালিকপক্ষের দাবি, ভাটার কারণে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, বিরাহিমপুর গ্রামের ভাই ভাই ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি নামের দুটি ইটভাটার উত্তর পাশের চারটি বোরো ধানের খেতের বিভিন্ন স্থানে ধানের গাছের ওপরের অংশ (আগা) মরে শুকিয়ে গেছে। অথচ ধানগাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত পানি রয়েছে।

বিরাহিমপুর গ্রামের কৃষক মো. সিরাজ প্রথম আলোকে বলেন, ধারদেনা করে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ করে ১১ গন্ডা জমিতে (৬৬ শতাংশ) বোরো ধান বর্গা চাষ করেছেন। গত শনিবার বিকেলেও খেতের চার পাশে হাঁটার সময় দেখেছেন ধানে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু রোববার সকালে এসে দেখেন খেতের বিভিন্ন স্থানে ধানের গাছগুলো মরে যাচ্ছে।

কৃষক সিরাজ বলেন, খেতে যদি পানি না দিতেন কিংবা খেত যদি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যেত তা হলে বুঝতেন পানির অভাবে এমন হয়েছে। কিন্তু খেতে পর্যাপ্ত পানি থাকা সত্ত্বেও ধানের গাছগুলো মরে যাচ্ছে।

তাঁর অভিযোগ, পার্শ্ববর্তী ইটভাটার ধোঁয়ার কারণেই এমন হচ্ছে। কারণ দক্ষিণ দিকের বাতাসে ইটভাটার ধোঁয়া এসে ফসলি জমিতে পড়েছে।

একই অভিযোগ আরেক কৃষক বেলাল হোসেনেরও। তিনি বলেন, ৩০ শতাংশ জমি চাষ করেছেন তিনি। খেতে পোকা কিংবা অন্য কোনো রোগবালাই কিছুই নেই। আগের দিনও খেতজুড়ে ধানের গাছগুলো সবুজ দেখা গেছে। এক দিন পরই হঠাৎ ধানগাছের আগা মরে যাচ্ছে। ইটভাটার ধোঁয়ার কারণেই এমন হচ্ছে। পাশাপাশি দুইটি বড় ইটভাটা। ভাটার মালিকেরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না। তাই এ ঘটনায় কৃষি বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

কৃষকদের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ভাই ভাই ইটভাটার অংশীদার মো. সিরাজ দাবি করেন, ইটভাটার কারণে বোরো খেতের ক্ষতি হওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। তাঁরা সরকারি নিয়ম মেনেই ইটভাটা করেছেন। অতীতে ভাটার কারণে কৃষকদের কিছু ক্ষতি হয়েছিল। তাঁরা তখন ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। সে কারণে এখন কৃষকেরা না বুঝে অভিযোগ করছেন।

এ বিষয়ে কথা হয় কৃষি বিভাগের ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ইটভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে বোরো ধানের গাছ মরে যাওয়ার অভিযোগ কৃষকেরা করলেও তিনি বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তাই তিনি কৃষকদের প্রাথমিকভাবে কিছু কীটনাশক লিখে দিয়েছেন খেতে প্রয়োগ করে দেখার জন্য। বিষয়টি তিনি উপজেলা পর্যায়ের সভায়ও উত্থাপন করেছেন বলে জানান।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বেগমগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ছাতারপাইয়া ইউনিয়নের উপসহকারী কর্মকর্তা তাঁকে বোরো খেতের সমস্যার বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি তাঁকে কৃষকদের খেতে কীটনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দিতে বলেছেন। ইটভাটার কারণে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে কি না, খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় লোকজন জানান, প্রায় আট বছর আগে বিরাহিমপুরে এই ইটভাটা দুটি গড়ে ওঠে। এরপর থেকে প্রতিবছর ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। এবার বোরো ধানের চারা রোপণের পর এই সমস্যা দেখা দিয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নোয়াখালী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবদুল মালেক বলেন, আইন অনুযায়ী ফসলি জমির পাশে ইটভাটা হওয়ার কথা নয়। ওই ইটভাটা দুটির ছাড়পত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।