যেখানে নারীরাই সব

এককালে ড্রেসিং টেবিলে সাজানো কাচের সুগন্ধি শিশি বা বোতলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল মা–খালাদের শৌখিনতা। নারীর রূপচর্চা এখন আর সেই ছোট্ট ড্রেসিং টেবিলনির্ভর নয়। নারী নিজেকে দেখতে চান, দেখাতে চান আরও উজ্জ্বল স্বচ্ছ আয়নায়, স্নিগ্ধ চেহারায়। নিজেকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের পথ ধরে রূপচর্চাকেন্দ্রের শুরু। এই রূপচর্চাকেন্দ্র নারীকে কেবল সুন্দরতম করে তোলেনি, দেখাচ্ছে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নও।

চট্টগ্রামে দিন দিন বাড়ছে পুরোপুরি নারী দ্বারা পরিচালিত এই ব্যবসার। একসময় বিউটি পারলার নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও সময়ের সঙ্গে এটি একটি শিল্প হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মতে এই শিল্পে এখন অনেক নারী জড়িত রয়েছেন।

টাচ লেডি পারলারে নববধূকে সাজাচ্ছেন নুরুন্নাহার । গত বৃহস্পতিবার সিরাজউদদৌলা সড়কে।  সৌরভ দাশ
টাচ লেডি পারলারে নববধূকে সাজাচ্ছেন নুরুন্নাহার । গত বৃহস্পতিবার সিরাজউদদৌলা সড়কে। সৌরভ দাশ

উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পর্যন্ত বেশির ভাগ নারীই এখন রূপচর্চাকেন্দ্রমুখী। সে কারণে রূপচর্চাকেন্দ্রের প্রসার বাড়ছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম নগরের চটেশ্বরী সড়কের নিউ লুকের স্বত্বাধিকারী নিগার সুলতানা। এক যুগ আগে মুম্বাই এবং ব্যাংকক থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এই রূপচর্চাকেন্দ্রের যাত্রা শুরু করেন এই নারী। এখন তাঁর প্রতিষ্ঠানটি শহরের সামনের সারির কয়েকটির মধ্যে একটি।

নিগার সুলতানা বলেন, এখন সবাই একটু সাজতে চায়। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাশনটা এবং স্টাইলটা পরিবর্তন হয় দ্রুত। পরিবর্তন হচ্ছে পছন্দও। তাই এখন অনেক নারী রূপচর্চাকেন্দ্রমুখী। এ কারণে বাড়ছে রূপচর্চাকেন্দ্রের। এটা একদিক থেকে ভালো। মেয়েরা কর্মমুখী হচ্ছেন। স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তবে সবকিছুর মান নিয়ন্ত্রণের জন্য একটা সংস্থা দরকার।

এখানে ২৫ জন কর্মী রয়েছেন। তাঁরা এটিকে পেশা হিসেবে নিয়ে নিজেদের উত্তরণ ঘটতে চান। কনিষ্ঠা চাকমা নামে এক কর্মী বলেন, স্বামী এবং দুই সন্তান নিয়ে পারলারের বেতনের টাকায় তিনি দিব্যি চট্টগ্রাম শহরে চলছেন।

তবে সমাজব্যবস্থার মধ্যেই নারীদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। তেমনি একজন ডালিয়া সুলতানা। স্বামী পরিত্যক্ত এই নারী নগরের পাহাড়তলী ওয়ারলেস কলোনি এলাকায় একটি ছোট বিউটি পারলার করেছেন। নিজের নামেই প্রতিষ্ঠানের নাম। এক বছর আগে এই প্রতিষ্ঠানটি চালু করেন।

রূপচর্চাকেন্দ্রে পরিচর্যা করছেন নিউ লুক বিউটি পারলারের নিগার সুলতানা। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টেশ্বরী সড়কে।  প্রথম আলো
রূপচর্চাকেন্দ্রে পরিচর্যা করছেন নিউ লুক বিউটি পারলারের নিগার সুলতানা। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টেশ্বরী সড়কে। প্রথম আলো

ডালিয়া সুলতানা বলেন, ‘চার বছর আগে বিয়ে হয়। দুবছর পর বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। এখন নিজের পারলারের আয় থেকে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে আমার সংসার চলে। নিম্ন আয়ের লোকজনের জন্য আমার এই পারলার।’ নিজের জমানো টাকা দিয়ে এই পারলার করেন তিনি।

নগরের জামালখান, আন্দরকিল্লা, মেহেদীবাগ, পাথরঘাটা, সদরঘাট, আগ্রাবাদ, হালিশহর, জিইসি কোথায় নেই রূপচর্চাকেন্দ্র। মেহেদীবাগের লুসি বিউটি পারলার এই শহরের প্রথম দিকের রূপচর্চাকেন্দ্র। এ ছাড়া ফায়ার টাচ, বিউটি বাফেট এবং পারসোনাসহ আরও অনেক সামনের সারির রূপচর্চাকেন্দ্র রয়েছে। কেন্দ্র ভেদে দামের পার্থক্য যেমন থাকে তেমনি কর্মীর সংখ্যাও কমবেশি হয়।

ডালিয়া বিউটি পারলারে গ্রাহকসেবায় ব্যস্ত ডালিয়া সুলতানা। গত বৃহস্পতিবার পাহাড়তলী ওয়্যারলেস এলাকায়।  প্রথম আলো
ডালিয়া বিউটি পারলারে গ্রাহকসেবায় ব্যস্ত ডালিয়া সুলতানা। গত বৃহস্পতিবার পাহাড়তলী ওয়্যারলেস এলাকায়। প্রথম আলো

নগরের আন্দরকিল্লা সিরাজদৌলা সড়কের টাচ লেডি নামের রূপচর্চাকেন্দ্রে রয়েছেন ১২ জন নারী কর্মী। কেন্দ্রটির মালিক নুরনাহার বেগম বলেন, বিউটি পারলার এখন শিল্পের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। অনেক লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

টাচ লেডিতে কর্মরত রেখা আক্তার জানান, তিনি আগে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। এখন এখানে কাজ করে দিব্যি তাঁর সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন।

তবে চট্টগ্রামে কী পরিমাণ রূপচর্চাকেন্দ্র রয়েছে তার কোনো হিসাব কারও কাছে নেই। শুধুমাত্র একটি ট্রেড লাইসেন্স এবং অন্যান্য কিছু দাপ্তরিক কাজ সেরে রূপচর্চাকেন্দ্র খোলা যায়। এ জন্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থাকাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

টাচ লেডিতে গতকাল সাজতে গিয়েছিলেন সুমনা পাল নামে একজন। তিনিও মনে করেন রূপচর্চাকেন্দ্রের কলেবর আগের চেয়ে বেড়েছে। প্রশিক্ষণ থাকলে মান আরও ভালো হবে।