শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পেতে এখনো অস্পৃশ্যতার শিকার নৃগোষ্ঠী-দলিতেরা

অধিকার ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ বৈষম্য ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পেতে গেলে এখনো তাঁরা অস্পৃশ্যতার শিকার হন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আজ রোববার সকালে ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি ‘বাংলাদেশের আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠী: অধিকার ও সেবায় অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। দেশের সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দলিত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে এ গবেষণা করা হয়। সারা দেশের ২৮টি জেলায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং স্থানীয় সেবা এ গবেষণায় প্রাধান্য পেয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদন পাঠ করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার আবু সাঈদ মো. জুয়েল মিয়া।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘মানুষের পরিচয়ভিত্তিক শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনার প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই দেশে এটি হওয়ার কথা না। আমরা বলছি না যে কোনো উন্নতি হয়নি। কিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের সংবিধানে যে অঙ্গীকারগুলো আছে, সে তুলনায় আমরা পিছিয়ে আছি।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১১ সালের তথ্য দিয়ে টিআইবি জানায়, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪০ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দলিতদের সংখ্যা ১৪ লাখ ৯০ হাজার ৭৬৬ জন। তবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় তাদের সংখ্যা ৪৫-৫৫ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আইন ও নীতিমালার সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সংবিধানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের পৃথক জাতিসত্তা ও দলিতদের পরিচয়ের স্বীকৃতি নেই। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ দলিত সম্প্রদায়ের শিশুদের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই। এ ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিও নেই। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে সব ধরনের কোটা তুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ৫ শতাংশ কোটা ছিল। গবেষণায় বলা হয়, কোট সংস্কারের দাবি অগ্রাহ্য করে এই ৫ শতাংশ কোটাও বিলুপ্ত করা হয়েছে। ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১১ তে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের প্রথাগত ভূমির মালিকানা নেই।
গবেষণায় বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দলিত সম্প্রদায়ের সন্তানেরা স্কুলে ভর্তিতে বাধা পায়। নিজ ধর্ম শিক্ষা ও মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হয়। অস্পৃশ্যতা চর্চার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানান ধরনের বৈষম্যের শিকার হয় তারা।
স্বাস্থ্যসেবা পেতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দলিত সম্প্রদায়ও নিয়মবহির্ভূত অর্থ দিতে বাধ্য থাকে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসক ও নার্সরা এ জনগোষ্ঠীর কোনো রোগীকে স্পর্শ করতে চান না। শয্যা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। গর্ভকালীন সেবা ও শিশুরা টিকা সেবা থেকেও বঞ্চিত হয় বলে উল্লেখ রয়েছে এ গবেষণায়।
নানান অধিকার থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দলিতরা বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানায় এ গবেষণা। ভোটাধিকার প্রয়োগে ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে বাধা পায়। গবেষণায় কয়েকজন দলিত ব্যক্তির সরাসরি বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে তাঁরা জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে তাঁরা কোনো নির্বাচনে ভোট দিতে যান না। নির্বাচন এলে বিভিন্ন পক্ষ তাঁদের শাসিয়ে যায়।
এ ছাড়া বিভিন্ন ভাতা, ভূমি অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্থানীয় সরকারেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দলিতরা বৈষম্যের শিকার হয় বলে গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। চাকরি পেতে এই প্রান্তিক গোষ্ঠীরাও ২০ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিয়ে থাকে।
গবেষণায় বলা হয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সহায়তা ও সরকারিভাবে নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিতে আদিবাসী ও দলিতদের জাতিসত্তা ও বর্ণভিত্তিক পরিচয়, ঐতিহাসিক বঞ্চনার বিষয় ও অধিকার যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত এবং স্বীকৃত নয়।
টিআইবি এ বৈষম্য রোধে ১৩টি সুপারিশ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের পৃথক পৃথক জাতিসত্তা ও দলিতদের সাংবিধানিক পরিচয়ের স্বীকৃতি, সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোটা পুনর্বহাল, বিদ্যমান আইন ও নীতিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও দলিতদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক করা, মাতৃভাষায় পাঠদান ও তার জন্য শিক্ষক নিয়োগ, সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা প্রদানে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।

গবেষণাটি নিয়ে সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংগঠন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন প্রথম আলোকে বলেন, গবেষণায় যে চিত্র উঠে এসেছে, সেটি বাস্তব। শিক্ষা, চিকিৎসা, ভূমি অধিকার—সব ক্ষেত্রেই নৃগোষ্ঠী ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘ভূমি কার্যালয়ে তো আমাদের মানুষ গেলে কেউ পাত্তাই দেয় না।’