ফিরে পাওয়ার আশা পূরণ হলো না

>* বনানীতে আগুন
* আগুন লাগার পর থেকে অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করেছেন স্বজনেরা
* আশায় ছিলেন তাঁরা
* কিন্তু ফিরলেন না তাঁরা
আগুন লাগার খবর শুনেই আবদুল্লাহ আল ফারুকের বাবা, ভাই আর বন্ধুরা বেরিয়ে পড়েছিলেন। একবার বনানীতে এফ আর টাওয়ারের কাছে, একবার হাসপাতালে চলছিল তাঁদের অস্থির ছোটাছুটি। বেলা তিনটা পর্যন্ত যাঁর ফোন সচল, তিনি নিশ্চয়ই বেঁচে আছেন, কোথাও না কোথাও আছেন—এমনটাই আশা ছিল তাঁদের। পূরণ হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক ছাত্র আবদুল্লাহ আল ফারুক ইইউআর সার্ভিসেস (বিডি) লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক ছিলেন। অফিস ছিল এফ আর টাওয়ারের ১২ তলায়। তাঁর বন্ধু মোস্তফা কামাল বলছিলেন, বেলা তিনটায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল বন্ধুর। তিনি ১২ বা ২২ তলায় আটকা পড়েছেন এটুকু শুনতে পেয়েছিলেন। তারপর ফোন বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই পরিবারের সদস্য আর বন্ধুরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়েন নানা দিকে। তাঁরা যখন চারদিকে ছোটাছুটি করছেন, কোনো এক ফাঁকে আবদুল্লাহ আল ফারুককে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁরা জানতে পারেননি। হঠাৎ তাঁদেরই এক বন্ধু রবিউল জানান, আবদুল্লাহ আল ফারুকের আইডি কার্ডের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তিনি মারা গেছেন। এর কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন আবদুল্লাহ আল ফারুকের ভাই আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, তাঁর ভাই আর নেই। আশপাশের মানুষের ফিসফাসে একসময় সত্যটা জানতে পারেন তিনি। চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আমার ভাই নাই, আমার ভাই নাই।’ ফারুকের বাবা মকবুল হোসেন ৯০ ভাগ পুড়ে যাওয়া শরীরটা দেখে সহ্য করতে পারবেন না এই আশঙ্কায় স্বজনেরা তাঁকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকেও ধরে রাখা যায়নি।
আবদুল্লাহ আল মামুনদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর। ডেমরার সারুলিয়ায় বহু বছর ধরে থাকেন। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে বাসায় রেখে কালও বেরিয়েছিলেন অফিসে। কিন্তু আর ফিরবেন না কখনো।
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গতকাল রাতে ছিল সাতটি মৃতদেহ। এর একটি রেজাউল করিম রাজুর। তিনি নয়তলার একটি অফিসে চাকরি করতেন। দুপুরের দিকে স্ত্রী মুন্নীকে ফোন করে বলেন, ‘আমার জন্য দোয়া কোরো। আমি যেন বেঁচে আসতে পারি।’ শেষ পর্যন্ত পারেননি। তাঁর স্বজনেরা বলছিলেন, আশা ছিল জীবিত উদ্ধার হবেন। হয়তো অগ্নিদগ্ধ হবেন, কিংবা হাত-পা ভেঙে যাবে। তবু বেঁচে থাকবেন। রেজাউলের বাড়ি চট্টগ্রামে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এই মানুষটির ওপর আত্মীয়স্বজনও আর্থিকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। তাঁর অবর্তমানে সবাই নিরুপায় হয়ে পড়লেন।
আগুন লাগার পর ওপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছেন এক যুবক—এমন একটা ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জানা যায়, তিনি মাকসুদুর রহমান। ওই ভবনের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করতেন। লাফিয়ে পড়েও বাঁচতে পারেননি। তখনই খোঁজ পড়ে তাঁর স্ত্রী রুমকী আক্তারের। দুজনেই একই জায়গায় কাজ করতেন। বছর তিনেকের সংসার। একসঙ্গে বেরোতেন, একই সঙ্গে ঢুকতেন বাসায়। গতকাল সন্ধ্যায় অজ্ঞাতনামা হিসেবে এসেছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। রাত নয়টার দিকে জানা যায়, এই মৃতদেহটিই মাকসুদুরের স্ত্রী রুমকীর।