এবার রাতে সাবাড় করা হচ্ছে সেই টিলা

টিলা কেটে বাড়ি হবে। দিনে শ্রমিক দিয়ে প্রকাশ্যে চলছিল টিলা কাটা। অভিযোগ পেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান চালায়, দুটো মামলা হয়। মামলার পর টিলার তিন দিকে টিনের বেড়া দিয়ে রাখেন টিলার মালিক। কয়েক দিন পর বেড়ার আড়ালে শুরু হয় টিলা কাটা। দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ফটক তালাবদ্ধ করে। তখন টিলা কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনের ধারাসংবলিত সাইনবোর্ড সাঁটানো হয়। প্রায় পাঁচ মাস বিরতি দিয়ে শুরু হয় আবার টিলা কাটা। এরপর আর পরিবেশ অধিদপ্তর নয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি অভিযোগকেন্দ্র ‘হটলাইন’-এর নির্দেশে সরাসরি অভিযান চলে। টিলা কাটা অবস্থায় একটি ট্রাক ও দুজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।

একটি টিলা কাটা বন্ধে প্রায় বছরব্যাপী ইঁদুর-বিড়াল খেলার পর সর্বশেষ দুদকের হস্তক্ষেপে স্বস্তি মিললেও তা আর বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। এবার দিনে নয়, টিলা সাবাড়ে চলছে রাতব্যাপী টিলা কাটা। দুদকের অভিযানের পাঁচ মাসের মাথায় আবার শুরু হয়েছে টিলা কাটা।

টিলাটি সিলেট নগরের উত্তর-পশ্চিম এলাকার কালীবাড়ি-হাওলাদারপাড়ায়। টিলার মালিক স্বপন কুমার দেব। অজিত রায় নামে টিলামালিকের আত্মীয় এক ব্যক্তি টিলা কাটার কাজ তদারক করছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন কৌশলে টিলার চার ভাগের তিন ভাগ কাটা শেষ হয়েছে। এখন আছে শুধু টিলার সবচেয়ে উঁচু একটি অংশ। সমতল থেকে প্রায় ৬০ ফুট উঁচু একদিক পুরোটা কেটে সমান্তরাল করায় সেখান থেকে টিলার কাটা অংশ ঢালের মতো দেখাচ্ছে।

রাতে টিলা কাটা দেখতে গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার রাতে বিভিন্ন সময় তিন দফা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, টিলা কাটা আর মাটি সরবরাহ নিয়ে নীরব এক বাণিজ্য শুরু করেছেন স্থানীয় কিছু লোক। রাত আটটা বাজতেই কালীবাড়ি থেকে হাওলাদারপাড়ার মহল্লার গলিপথ দিয়ে একটি-দুটো করে চলাচল শুরু করে ট্রাক। এসব ট্রাকের গন্তব্য একই জায়গা। একটি ট্রাকের সঙ্গে এগোতে গিয়ে দেখা গেল টিনের বেড়ার ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে টিলা কেটে ট্রাকে করে মাটি গন্তব্যে নেওয়ার কাজ। এ সময়ই কেবল জ্বালানো হয় বিদ্যুতের বাতি। এক পাশে আরেকটি টিলার চূড়ার ওপর থেকে দেখা গেছে, কাটা টিলার ঢালে বসে শাবল দিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে চলছে টিলা কাটা। পাশের টিলার চূড়া থেকে টিলা কাটার দৃশ্যটি অন্ধকার কোনো গুহায় আলো জ্বলা পরিবেশে শ্রমিকদের ছায়ার মতো দেখায়। ট্রাকভর্তি হয়ে গেলে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায় টিলা কাটা। এভাবে রাত আটটা থেকে ভোররাত পাঁচটা পর্যন্ত টিলা কাটা চলে বলে আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

এই টিলা কাটা নিয়ে গত বছরের ১৯ মে প্রথম আলোয় ‘টিলা সাবাড়ের কৌশল’ একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। পরদিন পরিবেশ অধিদপ্তর পরিদর্শন করে জানায়, অভিযানের সময় মালিককে না পাওয়ায় টিলা কাটার ঘটনায় দুটো মামলা হয়। এ ঘটনার মাসখানেক পর আবার টিলা কাটা শুরু হলে ফটকে পরিবেশ আইনের নির্দেশনা সাঁটানো হয়। এর পাঁচ মাস পর আবার টিলা কাটা শুরু হলে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র টিলা কাটা দেখে দুদকের ‘হটলাইনে’ ফোন করে প্রতিকার চাইলে গত বছরের ৯ অক্টোবর তাৎক্ষণিক অভিযান হয়। একটি ট্রাক জব্দ করে দুজন শ্রমিককে আটক করা হয়েছিল দুদকের অভিযানে। এরপর আর দিনে টিলা কাটা দেখা যায়নি। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রাতের পালায় শ্রমিক নিযুক্ত করে একটানা চলছে টিলা কাটা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাওলাদারপাড়া মহল্লার রাস্তাগুলোতে কিছু যুবক সতর্ক পাহারা দেওয়ার মতো করে ঘোরাফেরা করছেন। মাটির ক্রেতা সেজে একজনের কাছে জানতে চাইলে তিনি একজনের মুঠোফোন নম্বর দেন। ফোনে যোগাযোগ করলে নিজেকে টিলামালিক পরিচয় দিয়ে ওই ব্যক্তি জানান, কেবল ট্রাকভাড়া দিলেই মাটি বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। আইনি ঝামেলা হলে কী করণীয়, জানতে চাইলে তিনি ‘বিজিত চৌধুরীর লোক’ বলে ফোন কেটে দেন। পরে আরও দুবার ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

বিজিত চৌধুরী ওই এলাকার বাসিন্দা, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। অভিযোগ রয়েছে, টিলামালিকের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে তাঁর প্রভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের দুটো মামলা, দুদকের অভিযান—সবই সামাল দিয়ে টিলা কাটায় সহায়তা করছেন তিনি।

তবে বিজিত চৌধুরী ‘অভিযোগ ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে ভুয়া। ওই এলাকায় ৫০ শতক জায়গা ঘিরে একটি দুর্বৃত্ত চক্র টিলা কাটছে। টিলা কাটায় বিভিন্নজনকে সহায়তা করার নামে চাঁদাও তুলছে।’

একটি টিলা রক্ষায় একাধিক অভিযান, দুটো মামলা ও দুদকের অভিযানের পর এখন রাতে চলছে টিলা কাটা। বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আলতাফ হোসেন বিস্ময় প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলেন, সম্ভবত দিনে বাধা পেয়ে চলছে রাতে কাটা। তাহলে রাতে টিলা কাটলে কি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার নেই? এমন প্রশ্নে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বলেন, ‘রাতে তো কোনো অভিযান হয়নি, এরপরও দেখছি কী করা যায়।’

সিলেট নগরের উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম চা-বাগানবেষ্টিত হওয়ায় ছোট-বড় অসংখ্য টিলার অবস্থান রয়েছে। নগরে টিলা কাটা হচ্ছে আবাসন, সরকারি উন্নয়ন, রাস্তাঘাট করতে। নগরের বাইরে পাথরখণ্ডের পাহাড়গুলো কাটা হচ্ছে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে। ব্যক্তিমালিকানাধীন থেকে শুরু করে সরকারি জায়গায় থাকা এসব টিলার অস্তিত্ব প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে বলে খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে।