দুই শিশুসন্তান মারা গেছে বলা হয়নি দুই মাকে

বাস দুর্ঘটনায় গুরুতর দুই মা জয়পুরহাট আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুজনই শিশুসন্তান হারিয়েছেন। দুই শিশুর লাশ তখন পড়ে আছে হাসপাতালের মর্গে। কিন্তু এই কথা তাঁদের বলা হয়নি। তবে মায়ের মন অজানা আতঙ্কে ঠিকই কেঁদে উঠছে। মাঝেমধ্যে দুজনেই বলে উঠছেন, তাঁদের সোনামানিক কোথায়। নার্স আর স্বজনদের চোখ তখন জলে ভিজে আসছে। তাঁরা কোনোরকমে বলছেন, ‘আপনার সন্তান ভালো আছে। চিন্তার কোনো কারণ নেই।’
তিন বছরের শিশু রিপা হেমরম দুর্ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে। তার মায়ের নাম প্রমিলা হেমরম। মা-মেয়ে ওই বাসে করে বগুড়া থেকে জয়পুরহাটে আসছিলেন। মা এত বেশি আহত হন যে তাঁর বুকের ধন হেমরম যে নেই, জানতেই পারেননি। তাঁকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালে প্রমিলার নিকটাত্মীয় জেমাস বলেন, প্রমিলা রক্তাক্ত জখম হয়েছেন। মাঝেমধ্যেই মূর্ছা যাচ্ছেন। কখনো চেতনাশক্তি ফিরে এলেই তাঁর ছেলের খোঁজ করছেন। নিষ্ঠুর সেই সত্য কথাটি কেউ তাঁকে জানানোর সাহস পাচ্ছেন না। তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর নিয়ে যাবেন। ছেলে রিপার জন্য প্রমিলা মাঝেমধ্যে জোরে জোরে রিপা বলে ডাকছেন।
পাঁচবিবি উপজেলার পশ্চিম কড়িয়া গ্রামের সাত মাসের শিশুকন্যা হুমাইদা বেগম দুর্ঘটনাস্থলে বাসের চাপায় নিহত হয়। তার মা আয়শা সিদ্দিকা মাথায় ও শরীরে গুরুতর জখম নিয়ে একই হাসপাতালে ভর্তি। তিনি চিৎকার করে বলছেন, তাঁর সোনামণি হুমাইদাকে একটিবার যেন তাঁর কাছে এনে দেওয়া হয়। বারবার ডুকরে কেঁদে উঠছেন। পাশে থাকা স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, হুমাইদা ভালো আছে। সে তার দাদার কাছে আছে। কিন্তু মা আয়শা সিদ্দিকা এই মিথ্যে সান্ত্বনায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না। বারবার হুমাইদাকে একপলকের জন্য দেখতে চাচ্ছেন। কেউ তাঁকে বলতে পারছেন না মর্গে শুয়ে আছে হুমাইদা।
হুমাইদার চাচা একরামুল ইসলাম বলেন, আয়শা সিদ্দিকা তাঁর মেয়ের মর্মান্তিক এই মৃত্যুর ধাক্কা সামাল দিতে পারবেন না। এ কারণে তাঁকে মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। হুমাইদার বাবা হুমায়ন কবীর কুষ্টিয়ায় থাকেন। তিনি সেখানে একটি কোম্পানির কাভার্ড ভ্যানের চালক। আয়শা সিদ্দিকা বগুড়ায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। ২ এপ্রিল পাঁচবিবি কড়িয়া এলাকায় ঝড়ে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখানে আয়শা সিদ্দিকার বাবার বাড়ি। তা দেখতে ওই বাসে আসছিলেন।
জয়পুরহাট-বগুড়া সড়কের জয়পুরহাট সদর উপজেলার বানিয়াপাড়া গ্রামে গতকাল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাস রাস্তার পাশে খাদে পড়ে উল্টে যায়। এতে দুর্ঘটনাস্থলে আটজন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন নারী এবং রিপা ও হুমাইদাসহ তিন শিশু।