অর্ধশত খুনের মামলায় 'বড় ভাই'সহ প্রধান আসামিরা লাপাত্তা

>

• অর্ধশত খুনের মামলায় ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রধান আসামিরা
• ধরা না পড়ায় রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি কিছু মামলার
• উদ্ধার হয়নি ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র
• আসামি গ্রেপ্তারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন এক বাবা
• কয়েক দফা অনশন করেছেন এক মা

তিন বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেকে হারান আবু তাহের। প্রতিটি দিন আশায় থাকেন ছেলের খুনি প্রধান আসামি ধরা পড়বে। ভিডিও ফুটেজ, গ্রেপ্তার আসামিদের জবানবন্দি ও তদন্তে উঠে আসে, প্রধান আসামি ইব্রাহিম সোহানের ছুরিকাঘাতে খুন হন তাঁর ছেলে নাছিম আহমেদ। দুজনেই ছিলেন চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

মৃত্যুর আগে স্ত্রীর খুনিদের দেখে যেতে চান চিকিৎসক রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী। আসামি ধরা না পড়ায় চার বছরেও কেন, কারা তাঁর স্ত্রী নার্সিং কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অঞ্জলী রানী দেবীকে খুন করেছে, তা জানা যায়নি।

গত দুই বছরে চট্টগ্রামের আলোচিত অর্ধশত খুনের মামলায় কিছু আসামি গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রধান আসামিরা। ধরা না পড়ায় রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়নি কিছু মামলার। উদ্ধার হয়নি ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র। ‘বড় ভাই’সহ প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তারে গত মাসে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ছেলেহারা এক বাবা। কয়েক দফা অনশনও করেছেন ছেলেহারা এক মা। পুলিশ জানায়, ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম জেলায় ১২৬টি এবং গত বছর ১৪০টি খুনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে আলোচিত মামলা প্রায় অর্ধশত।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার পরপরই একাধিক মামলায় ক্লু (সূত্র) উদ্‌ঘাটন, আসামি গ্রেপ্তার, জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। যেসব মামলায় আসামি ধরা পড়েনি, তাদের ধরার জন্য অভিযান চলছে। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিন বর্ণনায় কয়েকটি ঘটনা

সম্প্রতি নগরের শের শাহ কলোনির বাসায় গিয়ে দেখা যায়, আবু তাহের অশ্রুসিক্ত হয়ে ছেলের ছবির অ্যালবাম দেখছেন। ২০১৬ সালের ২৯ মার্চ প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁর ছেলে নাসিম আহমেদকে খুন করা হয়। আবু তাহের বলেন, ‘প্রতিদিন আশায় থাকি, ছেলের খুনি ধরা পড়বে।’ ঘটনার পর থেকে পলাতক আসামি ইব্রাহিম সোহানের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করলেও পুলিশ তঁাকে ধরতে পারছে না। চকবাজার থানার ওসি নেজাম উদ্দিনের ভাষ্য, অভিযান চালিয়েও আসামির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি নগরের পাঁচলাইশের তেলিপট্টি এলাকার নিজ বাসার গলির মুখে অঞ্জলী রানী দেবীকে কুপিয়ে হত্যার কিনারা হয়নি চার বছরেও। মামলাটির তদারককারী কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামান বলেন, ক্লু পাওয়া যায়নি বলে জড়িতরা কেউ ধরা পড়েনি।

আদনান হত্যার আসামি এনামুল হক ও সুদীপ্ত হত্যার আসামি পিচ্চি হানিফ
আদনান হত্যার আসামি এনামুল হক ও সুদীপ্ত হত্যার আসামি পিচ্চি হানিফ

দুটি হত্যা ও পুলিশকে গুলি করে হত্যার চেষ্টাসহ তিন মামলার তদন্তে তিন ‘বড় ভাই’য়ের নাম বেরিয়ে আসে। কিন্তু কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে গত বছরের ১৬ জানুয়ারি জামালখান মোড়ে আদনান ইসফারকে (১৫) ছুরিকাঘাতে খুন করে একদল কিশোর। সে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। এ ঘটনায় করা মামলার অভিযোগপত্রে পুলিশ বলছে, কিশোরদের ঘটনায় ব্যবহৃত পিস্তলটি কিশোরদের দেন এনামুল হক নামের এক ‘বড় ভাই’। তাঁকে ধরতে অভিযান চলছে বলে জানান কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন।

স্কুলপড়ুয়া ছেলেদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া নগরের ২ নম্বর গেট এলাকার কথিত বড় ভাই ওমর ফারুকের হদিস পুলিশ এক বছরেও পায়নি। গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি নগরের ২ নম্বর গেট এলাকায় তিনটি মোটরসাইকেলযোগে ছয় কিশোর যাওয়ার সময় পুলিশ থামার সংকেত দেয়। তখনই পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। অতর্কিতে গুলিতে হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ হন পাঁচলাইশ থানার সহকারী উপপরিদর্শক আবদুল মালেক।

২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর ভোরে নগরের সদরঘাট থানার নালাপাড়ার বাসায় হানা দিয়ে নগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে খুনের মামলায় নগরের লালখান বাজার এলাকার ‘পিচ্চি হানিফ’ এক ‘বড় ভাই’য়ের নাম আসে গ্রেপ্তার আসামিদের জবানবন্দিতে। আসামি গ্রেপ্তারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন নিহত সুদীপ্ত বিশ্বাসের বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রামের পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, বড় ভাইকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে কয়েক দফায় অনশন পালন করেন মা জাহেদা আমিন চৌধুরী। ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকার ভাড়া বাসা থেকে দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর বড় বোন জুবাঈদা সরওয়ার চৌধুরীর অভিযোগ, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও পুলিশ ধরছে না।

পুলিশকেই আসামি ধরতে হবে

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী মনে করেন, খুন করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলে ঘটনা বাড়তে থাকবে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আসামিরা তো উড়ে যায়নি। দেশেই আছে। তাহলে পুলিশ তাদের পাবে না কেন?’