ফাহমিদার মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে দুই চালক রিমান্ডে

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা হক লাবণ্যকে হালকা প্রকৃতির হেলমেট পরতে দেন উবারের মোটরসাইকেল চালক সুমন হোসেন। সেদিন চালক সুমন নিজেও বেপরোয়াভাবে দ্রুত গতিতে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতকে (সিএমএম) এক প্রতিবেদন দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ।
এদিকে ফাহমিদা হক লাবণ্য নিহতের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই চালককে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার সিএমএম আদালত রোববার এই আদেশ দেন।
রোববার দুপুরে দুই চালককে ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করে সাত দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ। আদালত সূত্র বলছে, কাভার্ড ভ্যান চালক আনিছুর রহমানকে (২৭) চার দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেন আদালত। আর উবারের মোটরসাইকেল চালক সুমন হোসেনকে (২৩) দুই দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নুরুল ইসলাম রোববার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, দুই চালককে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে। দুজনই এখন শেরেবাংলা নগর থানা হেফাজতে আছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউটের সামনের সড়কে ফাহমিদাকে বহনকারী একটি রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয় বেপরোয়া গতির একটি কাভার্ড ভ্যান। এ সময় মোটরসাইকেলের চালক বাঁ দিকে ও ফাহমিদা ডানদিকের সড়কে পড়ে যান। দ্রুতগতির কাভার্ড ভ্যানটি ফাহমিদাকে চাপা দিয়ে চলে যায়। পরে ফাহমিদাকে উদ্ধার করে পাশের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।এ ঘটনায় ফাহমিদার বাবা এমদাদুল হক বাদী হয়ে অজ্ঞাত চালককে আসামি করে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।
ফাহমিদা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ঘটনার দিন শ্যামলীর বাসা থেকে মহাখালীতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাচ্ছিলেন তিনি।
পুলিশ প্রতিবেদন দিয়ে আদালতকে বলেছে, কাভার্ড ভ্যান চালক আনিছুরের বাড়ি দিনাজপুরে। আর উবার চালক সুমনের বাড়ি পিরোজপুর। ফাহমিদা গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৪৬ মিনিটে উবার চালক সুমনের মোটরসাইকেলে করে জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউটের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় কাভার্ড ভ্যান চালক আনিছুর ফাহমিদাকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ফাহমিদাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। চালক সুমন হাসপাতালে মোবাইল নম্বর ঠিকঠাক দিলেও তাঁর ভুল নাম-ঠিকানা দেন। ফাহমিদা মারা গেছেন জানার পর কাউকে কিছু না বলে তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। মামলার ঘটনাস্থল এবং আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আদালতকে পুলিশ আরও বলেছে, আনিছুর রহমানের হেফাজত থেকে কাভার্ড ভ্যানটি জব্দ করা হয়েছে। একইভাবে উবার চালক সুমনের মোটরসাইকেলটিও জব্দ করা হয়েছে। কাভার্ড ভ্যান জব্দ করা হয়েছে আশুলিয়া থেকে। আর মোহাম্মদপুর থেকে জব্দ করা হয় মোটরসাইকেলটি। আসামি সুমন উবার এবং বিকাশ রেজিস্ট্রেশনে যে ঠিকানা দিয়েছেন তা সঠিক নয়। কাভার্ড ভ্যান চালক জিজ্ঞাসাবাদের সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। তবে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার একপর্যায়ে কাভার্ড ভ্যানে চাপা দেওয়ার কথা স্বীকার করেন চালক আনিছুর।
রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনে বলা হয়, উবার চালক সুমন পূর্বপরিকল্পিতভাবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদার মৃত্যুর ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন কি না, তা জানার জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি। আর প্রধান আসামি কাভার্ড ভ্যান চালক আনিছুর উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন কি না, তা জানার জন্য তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন। এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।
আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে কাভার্ড ভ্যান চালক আনিছুর এবং মোটরসাইকেল চালক সুমনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দুই চালকেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স জব্দ করা হয়েছে। উবার চালক সুমন জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাস। বিভিন্ন জায়গায় চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করেন। চাকরি না পেয়ে মোটরসাইকেল কেনেন।
চালক সুমন কত দিন ধরে ঢাকায় মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন সে ব্যাপারে পুলিশ কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম জানান, আসামির জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। কত দিন ধরে সুমন মোটরসাইকেল চালিয়ে আসছিলেন, তা জানা হবে।