ডিএনএ থেকে খুনি শনাক্ত, তবে আগেই জামিন
>• পল্লবীতে ধর্ষণের পর খুন
• মূল আসামি জামিনে বেরিয়ে গেছেন
• তরুণীকে হত্যার পর মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়
রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসায় দুই বছর আগে এক তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা। পুলিশ যাতে ওই তরুণীর পরিচয় বের করতে না পারে, সে জন্য তাঁর মাথা ফেলা হয়েছিল এক জায়গায়, শরীরের বাকি অংশ ফেলা হয়েছিল আরেক জায়গায়। মাথাবিহীন শরীর উদ্ধারের পর অপরাধীর ডিএনএ নমুনা (বীর্য) সংগ্রহ করে রেখেছিল পুলিশ।
পরে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হন সন্দেহভাজন এক ব্যক্তি, তাঁর সঙ্গে ওই ডিএনএ নমুনার মিল পাওয়া যায়। তবে ডিএনএ পরীক্ষার ফল পুলিশের হাতে আসার আগেই কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে যান সন্দেহভাজন আসামি।
ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাটি ২০১৭ সালের ২২ মার্চের। সেদিন রাজধানীর খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকার একটি নালার পাশ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক তরুণীর মাথাবিহীন বস্তাবন্দী লাশ (২৫) উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের হাত-পা গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। পুলিশ লাশের আঙুলের ছাপ নিয়ে প্রথমে তরুণীর নাম জানতে পারে। কুলসুম নামের ওই তরুণী পোশাককর্মী। ২০১৭ সালের শেষের দিকে ডিএনএ পরীক্ষার ফল হাতে পায় পুলিশ। তাতে নিশ্চিত হওয়া যায়, সন্দেহভাজন আসামি এনামুল হকই ধর্ষণ ও খুনে জড়িত।
কুলসুম সপরিবার পল্লবীর ইলিয়াস মোল্লাহর বস্তিতে থাকতেন। তাঁর দুই সন্তান, স্বামী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। হত্যার ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় এ নিয়ে মামলা হয়।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপকমিশনার মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমেই মূল অপরাধী কে, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থাপিত ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে গত ১২ বছরে (২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত) পাঁচ হাজার মামলায় ১৫ হাজার ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এই তথ্য জানিয়ে ল্যাবরেটরির প্রধান অধ্যাপক শরীফ আকতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, অপরাধী শনাক্তের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে এখন ডিএনএ প্রযুক্তি কাজে লাগানো হয়। এর আইনি ভিত্তি আছে।
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কুলসুমের মুঠোফোনের সূত্র ধরে বিমানবন্দর থানার পুলিশ ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল তাঁর প্রতিবেশী এনামুল হককে গ্রেপ্তার করে। তিনি পেশায় প্রাইভেট কারের চালক। কুলসুমের সঙ্গে এনামুল তাঁর সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করলেও খুন করার কথা অস্বীকার করেন। পাঁচ মাস কারাভোগের পর তিনি ওই বছরের সেপ্টেম্বরে জামিনে বেরিয়ে যান।
সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার পল্লবী এলাকায় অভিযান চালিয়ে এনামুলের ঘনিষ্ঠ আবুল কাশেম ও কালু মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে গ্রেপ্তার দুজন এনামুলের সঙ্গে মিলে কুলসুমকে খুন করার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এনামুলকে গ্রেপ্তারের জন্য আদালতে আবারও আবেদন করা হবে।
মূল অপরাধী জামিন পাওয়ার পর কীভাবে পালিয়ে যায়, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কুলসুমের ভাই মো. রাজীব। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুলসুমকে প্রতি রাতে স্বপ্নে দেখে কেঁদে ওঠেন মা। আমরা শুধু অসহায়ের মতো চেয়ে থাকি, কিছুই করতে পারি না।’
এদিকে জিজ্ঞাসাবাদে কালু ও কাশেম ডিবি কর্মকর্তাদের বলেন, ঘটনার দিন সকালে এনামুল ফোনে অসুস্থতার কথা জানিয়ে কুলসুমকে খাওয়ার স্যালাইন আনতে বলেন। কুলসুম বাসায় পৌঁছানোর পর এনামুল তাঁকে ধর্ষণ করেন। তখন সেখানে কাশেম ও কালু ছিলেন। ধর্ষণের পর তিনজনে মিলে বঁটি দিয়ে কুপিয়ে কুলসুমের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এরপর মৃতদেহ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরেন। কালু এনামুলকে ৫০০ টাকা দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা আনতে বলেন। এরপর কালু ও কাশেম মাথার টুকরা মিরপুর ১২ নম্বরের বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান। তাঁরা খণ্ডিত মাথা ম্যানহোলে ফেলে দেন। আর এনামুল বস্তাভর্তি দেহটি অটোরিকশায় তুলে খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকার একটি ড্রেনের পাশে ফেলে দিয়ে আসেন।
কুলসুমের খণ্ডিত মাথাটি আর উদ্ধার করা যায়নি বলে জানান মামলার আরেক তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার মহরম আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার কালু ও আবুল কাশেমকে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হবে।