আরও দু-একজনের জবানবন্দির পর অভিযোগপত্র তৈরিতে হাত

>• হত্যায় জড়িত ১৬ জনের সবাই গ্রেপ্তার
• দায় স্বীকার করে জবানবন্দি ১২ জনের
• এখন রিমান্ডে আছেন তিন আসামি
• তিন আসামির জবানবন্দি নেওয়ার চেষ্টা
ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান হত্যাকাণ্ডে আরও দু-এক আসামির জবানবন্দি নেওয়ার পর অভিযোগপত্র তৈরির কাজে হাত দেবে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চলতি মাসে অভিযোগপত্র দাখিল হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ১২ জন দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই সূত্র জানায়, নুসরাত জাহান হত্যাকাণ্ডে যে ১২ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া দুই তরুণীসহ পাঁচজন রয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল ফেনীর আদালতে জবানবন্দি দেন মহিউদ্দিন ওরফে শাকিল। শাকিল অবশ্য ঘটনার দিন ৬ এপ্রিল মাদ্রাসা চত্বরে পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
পিবিআই সূত্র আরও জানায়, এই হত্যা মামলার আরও তিন আসামির রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। তাঁরা হলেন সোনাগাজী পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুর রহমান, মাদ্রাসার ইংরেজির প্রভাষক আফসার উদ্দিন ও মোহাম্মদ শামীম ওরফে শামীম (২)। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁদের জবানবন্দি নেওয়ারও চেষ্টা হচ্ছে। এরপরই অভিযোগপত্র তৈরির কাজে হাত দেবে পিবিআই।
গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান ওরফে রাফি আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা তাঁর গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। গুরুতর অবস্থায় ওই দিন তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক ইউনিটে ভর্তি করা হয়। গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টার দিকে তিনি মারা যান। এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি পাঁচজন অংশ নেন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আটজন।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাঈন উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে ১৬ আসামির। তাঁদের মধ্যে ১২ জনই দায় স্বীকার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনজন রিমান্ডে আছেন। তাঁদেরও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
মাঈন উদ্দিন আরও বলেন, ‘নুসরাত খুনের ঘটনাটি দ্রুত উদ্ঘাটিত হয়েছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে শতভাগ আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। সব আসামির জবানবন্দি নেওয়ার কাজ শেষ হলে অভিযোগপত্র তৈরির কাজে হাত দেওয়া হবে। তবে চলতি মাসের মধ্যেই অভিযোগপত্র দাখিল সম্ভব বলে আমরা আশাবাদী।’
পিবিআইয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নুসরাতের ওপর অগ্নিসন্ত্রাসের ঘটনায় কেরোসিন ও বোরকা ব্যবহার করেছে চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা। ইতিমধ্যে কেরোসিন ও বোরকা বিক্রেতা ও বোরকা দোকানের কর্মচারী, নুসরাতের দুই বান্ধবী তথা আলিম পরীক্ষার্থী, মাদ্রাসার একজন নৈশপ্রহরী ও একজন পিয়নসহ মোট সাতজনের সাক্ষ্য আদালত নিয়েছেন। এই সাতজনই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, নুসরাতের ওপর অগ্নিসন্ত্রাসের দিন অন্যতম প্রধান তিন আসামি শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম (১), জুবায়ের আহমেদ ও জাবেদ হোসেন বোরকা পরিহিত ছিলেন। পিবিআই আলামত হিসেবে দুটি বোরকা উদ্ধার করেছে। জুবায়েরের ব্যবহৃত বোরকা গত ২০ এপ্রিল সোনাগাজী কলেজ-সংলগ্ন একটি খাল থেকে এবং শামীমের ব্যবহৃত বোরকা গত ৪ মে মাদ্রাসার পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু জাবেদ হোসেনের ব্যবহৃত বোরকা উদ্ধার করা যায়নি। বোরকাগুলো কিনেছিলেন আরেক ছাত্রী কামরুন নাহার ওরফে মণি। মণিও গ্রেপ্তার হয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
গত ১৪ এপ্রিল ফেনীর আদালতে দায় স্বীকার করে প্রথম জবানবন্দি দেন শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম (১) ও নুর উদ্দিন। গত ২৭ মার্চ নুসরাতের শ্লীলতাহানি থেকে শুরু করে ৬ এপ্রিল তাঁর ওপর অগ্নিসন্ত্রাস চালানোর ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন তাঁরা। এই হত্যাকাণ্ডের পর খুনিরা বিষয়টি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন এবং পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে জানিয়েছেন।
নুসরাত হত্যাকাণ্ডের আগে অধ্যক্ষ ‘সিরাজ উদদৌলা সাহেবের মুক্তি পরিষদ’ নামের ২০ সদস্যের কমিটির জন্য টাকা দিয়েছেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা জনৈক কেফায়েত উল্লাহ। এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন নুর উদ্দিন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন শাহাদাত হোসেন শামীম। নুর উদ্দিন সোনাগাজী মাদ্রাসা শাখা ছাত্রদলের সভাপতি এবং শাহাদাত হোসেন একই মাদ্রাসার ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন।