
চাচাতো ভাইয়ের টেস্টারের আঘাতে দুই চোখ হারানো কিশোর মিলন হোসেন বিল্লাল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরেছে। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সে তার বাবা ও বোনের সহায়তায় বাড়িতে ফেরে।
মিলন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের গোড়াই ইউনিয়নের রাজাবাড়ি বানিয়াচালা গ্রামের গিয়াস উদ্দিন ও জাহানারা বেগম দম্পতির ছেলে। গত ১২ এপ্রিল চাচাতো ভাই মামুনের সঙ্গে ডিশ লাইন সংযোগের কাজ করতে যায় মিলন। সেখানে কাজের মজুরি চাওয়াতে টেস্টার দিয়ে মিলনের চোখে আঘাত করেন মামুন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মিলনের বাবা কারখানার শ্রমিক। একমাত্র ছেলে মিলন চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। তার ছোট চাচা মজিবর রহমানের ছেলে মামুন (২৫) ডিশ সংযোগের কাজ করেন। তাঁর কাজে সহযোগিতা করত মিলন। তবে কাজের জন্য তাকে কোনো মজুরি দেওয়া হতো না। ঘটনার দিন বিকেল পাঁচটার দিকে মামুন ফোন করে কাজের জন্য মিলনকে ডেকে নিয়ে যান। মামুন ফোন করে বলেন, মিলন কাজ করার সময় ভবনের ছাদ থেকে পড়ে আহত হয়েছে। তাকে কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মিলনের অবস্থা খুবই খারাপ। পুরোপুরি অচেতন অবস্থায়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক ফরিদুল হাসান জানান, মিলনের চোখ ঠিক করতে তাঁরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
ঢাকা মেডিকেলে টানা চিকিৎসা চললেও মিলন কথা বলতে পারছিল না। সেখানে ১৯ দিন চিকিৎসার পর ১ মে তার চেতনা ফেরে। এরপরই জানা যায় নেপথ্যের ঘটনা, সে পড়ে আহত হয়নি, তাকে পেটানো হয়েছে। মিলনের ভাষ্য, ঘটনার দিন তাদের সঙ্গে ছিলেন পাশের বাড়ির আলামিনও (১৯)। তিনজন মিলে পাশের গোড়াই শিল্পাঞ্চলের নিউটেক্স গ্রুপ কারখানাসংলগ্ন একটি বাসায় ডিশ সংযোগের কাজ করতে যায়। একপর্যায়ে মামুনের কাছে কাজের মজুরি দাবি করে মিলন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে পাশের একটি তিনতলা ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মামুনের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিদ্যুতের কাজে ব্যবহৃত টেস্টার দিয়ে তার ডান চোখে সজোরে আঘাত করেন মামুন। আঘাতের কারণে নিস্তেজ হয়ে পড়ে মিলন। পরে তার বাঁ চোখেও আঘাত করা হয়।
এ ঘটনায় মিলনের মা জাহানারা বেগম বাদী হয়ে ৯ মে টাঙ্গাইলের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে মামলা করেন। এতে আসামি করা হয় মামুন, আলামিন ও ডিশ ব্যবসায়ী কবির হোসেনকে।
গতকাল মিলনদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশের শতাধিক নারী-পুরুষ মিলনকে দেখতে এসেছেন। মিলনকে জড়িয়ে ধরে মা জাহানারা কেঁদে কেঁদে মূর্ছা যাচ্ছেন। পাশে তার বাবা বসে আছেন।
মিলনের বড় বোন নাছরিন বেগম জানান, সকাল ছয়টার দিকে তিনি ও তাঁর বাবা মিলনকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। মায়ের দুর্বলতার কথা চিন্তা করে বাড়িতে আসার খবরটি তাঁরা গোপন রাখেন। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তাঁরা বাড়িতে পৌঁছান।
ঘরের বিছানায় শুয়ে থাকা মিলনের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। বাড়িতে কেমন লাগছে, প্রশ্ন করতেই মিলন মৃদু হেসে বলে, ‘খুব ভালো লাগতাছে। তবে মারে কানবার না করি। হে খালি কান্দে। আমি ভালো অয়্যা যামু কই, তা-ও কান্দে।’
জাহানারা বলেন, ‘ওর যে কী ক্ষতি অইছে, ও কি বুঝব? আমার কইলজ্যা পুইর্যা যাইত্যাছে। আমি বুঝতাছি ওর কী অইছে।’ মিলনের বাবা গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘কত কষ্টের পুলাডা আমার। আমি আর কাম করুম কার জন্য। কারে কামাই কইর্যা খাওয়ামু। আমার যে এত বড় সর্বনাশ করল, তার বিচার চাই।’
মিলনের চাচাতো ভাই মামুনদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে তাঁরা বাড়িছাড়া।
মির্জাপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোশারফ হোসেন জানান, মিলনের মা জাহানারা বেগমের করা মামলাটি আদালতের নির্দেশে রোববার রাতে থানায় এফআইআরভুক্ত হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।