বিন্দু থেকেই হাবিবার শরদিন্দু

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে বরাদ্দ পাওয়া নিজের ছোট্ট জায়গাটুকুতেই পোশাক নকশার অনুষঙ্গ থাকত। আর বৃহস্পতিবার হলেই ইসলামপুর ঘুরে পোশাকের কাঁচামাল নিয়ে গাজীপুরে নিজের বাসায় ছুট। নিজে কাপড় টাই-ডাই, নকশা, শুকানো থেকে শুরু করে প্যাকিং করতেন। সঙ্গে মা-বোনও কাজে হাত বাড়িয়ে দিতেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস তো ছিলই। হাবিবা আক্তারের সেই ছোটাছুটির ফলই এখন শরদিন্দু। অনলাইনে পোশাক বিক্রির অন্যতম পরিচিত এক ফেসবুক পেজ।
ফ্যাশনের প্রতি হাবিবা আক্তারের ঝোঁক ছোট থেকেই। পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগে। হাবিবা বলেন, ‘আমি বুটিকসের দোকানগুলোয় ঘুরতাম প্রচুর। তখন মনে হতো, বাজারে যেসব দেশীয় বুটিকস আছে, সেখানে পছন্দসই পোশাকগুলো সব সময় শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য না। সেই চিন্তা তো ছিল। এ ছাড়া ছোট থেকেই লক্ষ্য ছিল ফ্যাশন ডিজাইনার হব।’
নিজেই নিজের পোশাক নকশা করে পরতেন হাবিবা। তাঁর পোশাক দেখে অনেকে আগ্রহ প্রকাশ করলে নিজেই ব্যবসার কথা ভাবেন। হাবিবা বলেন, ‘চার হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে হল থেকেই শুরু করি। সেটা ২০১৬ সালের শেষ দিকে। হলের ছোট জায়গাতেই কাজ করতে হতো। আর বৃহস্পতিবার এলে ইসলামপুর থেকে কাপড় কিনে গাজীপুরে নিজের বাড়ি চলে যেতাম। সেখানে টাই-ডাই, নকশা, শুকানো থেকে প্যাকিং নিজেই করতাম। মা-বোন সাহায্য করত। অনলাইনে ব্যবসা দেখাশোনার দায়িত্বও নিজের করতে হতো। আবার ক্লাস তো ছিলই।’
কয়েক মাস পর শরদিন্দুর সঙ্গে যুক্ত হন তানভীর হোসাইন। তিনি এখন হাবিবার জীবনসঙ্গী। ব্যবসার আর্থিক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এখন তানভীর দেখেন। আর পোশাকের ডিজাইনার ও অনলাইনে প্রমোশনের কাজ করেন হাবিবা। তবে পথ এতটা মসৃণ ছিল না বলে জানান তিনি। হাবিবা বলেন, ‘মেয়ে হিসেবে কোনো কাজ শুরু করতে গেলে চ্যালেঞ্জের শেষ নেই। মেয়েদের ঘড়ির কাঁটা রাত নয়টায় বন্ধ হয়ে যায়। শরদিন্দুর জন্য হল ছাড়তে হয়। একা মেয়ে বাসা নিই। সেখানেও কাজ শেষ করে একটু রাত হলেই বাঁকা চাহনি ছিল। কাঁচামাল কিনতে গেলে মেয়ে বলে দাম বেশি চাইত।’ এ ছাড়া হাবিবা জানান, মায়ের আগ্রহ থাকলেও বাবা শুরুতে চাইতেন না তাঁর মেয়ে পোশাক নিয়ে ব্যবসা করুক। আশপাশের লোকজনও ভালোভাবে নেননি। সাফল্য আসায় সবাই এখন সাধুবাদ জানাচ্ছেন। কাঁচামালের দোকানিদের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক হয়েছে।

অনলাইনে কেনাকাটায় ক্রেতার মনে ঠকে যাওয়ার একটা ভয় থাকে। অনেকেই পোশাক সরাসরি দেখতে চান। হাবিবা বলেন, পোশাক পছন্দ হলে ক্রেতা নিজের হাতে নিয়ে দেখলে আস্থা পান। শরদিন্দুর পোশাক সরাসরি দেখে কেনার সুযোগ দিতে ২০১৮ সালের শেষ দিকে ধানমন্ডির হ্যাপি আর্কেড শপিং মলে আউটলেট চালু হয়। আর অনলাইনে ফেসবুকে তো চলছেই।
সাহস করে একা শুরু করা হাবিবার সঙ্গে ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে আছেন তাঁর স্বামী। শরদিন্দুর বয়স খুব বেশি না। উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। শরদিন্দুতে ১০ জন কর্মী আছেন, যার মধ্যে পাঁচজনই নারী। এ ছাড়া কারখানায় কাজ করেন আরও প্রায় ১০ জন। ঈদের পরে আরও দুটি আউটলেট দেওয়ার কথা ভাবছেন।
অল্প সময়েই পরিচিতি পাওয়া এবং উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে হাবিবা বলেন, ‘অন্য মানুষ কী করছে, তা না ভেবে নিজে কী পারি, সেটাতে মনোযোগী হতে হবে। ক্রেতার সঙ্গে সৎ থাকতে হবে।’
হাবিবা ডিজাইনার হিসেবে নিজেকে এগিয়ে নিতে চান। ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেবেন বলে জানান। তিনি বলেন, তাঁর নকশার করা প্রতিটি পোশাকেরই আলাদা গল্প বলতে থাকে। সাহিত্যের নানান চরিত্রও তিনি পোশাকে ফুটিয়ে তোলেন। জানালেন, এক নারী দিবসে বীরাঙ্গনাদের তুলে এনেছিলেন তাঁর পোশাকের নকশায়। এবার ঈদুল ফিতরে মুঘল স্থাপত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে পোশাকে নকশা করেছেন।