সেই পারভেজই এখন পা হারা

দুই বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার একটি বাস থেকে একাই ৪০ জনকে উদ্ধার করে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন হাইওয়ে পুলিশের কনস্টেবল পারভেজ মিয়া। বীরত্বের সে গল্প ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পেয়েছিলেন পুলিশের সর্বোচ্চ সম্মাননা বিপিএম পদক। সেই পারভেজই এবার সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হলেন।
গত সোমবার (২৭ মে) মুন্সিগঞ্জের জামালদি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পিকআপ ভ্যানের চাপায় থেঁতলে যায় পারভেজের ডান পা। এরপর বুধবার অস্ত্রোপচার করে পারভেজের সেই পা কেটে ফেলেছেন চিকিৎসকেরা। মানবিক ও সাহসিকতার প্রতীকে পরিণত হওয়ায় পারভেজের এখন সময় কাটছে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে পঙ্গু হাসপাতালে কথা হয় পারভেজের সঙ্গে। অর্ধেক শরীরে ব্যান্ডেজ জড়ানো অবস্থায় কথা বলার শুরুতেই শোনালেন দুই বছর আগের সেই সাহসিকতার গল্প।
৭ জুলাই ২০১৭। সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। দুপুরের দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করছিলেন পারভেজ। খবর আসে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়ক থেকে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডোবায় পড়েছে। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে যান তিনি। আবর্জনায় ভর্তি ডোবা। বৃষ্টির পানি জমে আরও বেশি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। আশপাশে মানুষের ভিড়। কিন্তু কেউই উদ্ধার কাজে নামছেন না। অন্যদিকে, বাসের ভেতরে আটকা পড়া মানুষের তখন বাঁচার আকুতি।
‘আমি তখন একাই ডোবায় নামি। একটি ইট দিয়ে বাসের জানালার কাচ ভেঙে ভেতরে যাই। প্রথম উদ্ধার করি তিন মাসের এক শিশুকে। এরপর একাই ২৬ জনকে বাইরে নিয়ে আসি। ততক্ষণে অন্যরাও এগিয়ে এসেছে। সবার চেষ্টায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায় ৪০টি প্রাণ।’ —বলছিলেন পারভেজ।
এই গল্প শেষেই পারভেজের আক্ষেপ, ‘ভাগ্যের কী পরিহাস। যে মানুষটার অছিলায় ৪০ জনের জীবন বাঁচল, আজ সে মানুষটাই পঙ্গু হয়ে গেল। ওই ঘটনার সময় কে ভেবেছিল আমার ভাগ্যে এমন পরিণতি লেখা আছে।’
পারভেজ তাঁর দুর্ঘটনার বিষয়ে বলেন, মুন্সিগঞ্জের জামালদি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের একটি সিসি ক্যামেরা কাজ করছিল না। সেটি দেখতে গত সোমবার বিকেলে মুন্সিগঞ্জের নিজ কর্মস্থল থেকে বাসে করে ওই বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যান তিনি। বাস থেকে নেমে রাস্তা পার হতে গেলেই দ্রুত গতিতে আসা একটি পিকআপ ভ্যান তাঁকে চাপা দেয়। এতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল, পরে ঢাকা মেডিকেল হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয় পারভেজকে।

হাসপাতালে পারভেজকে সঙ্গ দিচ্ছেন ছোট ভাই মহিউদ্দিন ও মেজো বোন রত্না মণি। বাড়িতে স্ত্রী সাবরিনা জাহান, নয় মাসের মেয়ে ফাতেমাতুজ জোহরা, বাবা আর ব্রেন স্ট্রোকের রোগী মা। পারভেজ বলছিলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। আমার পঙ্গুত্ব পরিবারের জন্য অন্ধকার ডেকে এনেছে। পরিবারে আমিই একটু পড়াশোনা করেছিলাম। আল্লাহর রহমতে পুলিশে চাকরি পাই। ১২-১৪ হাজার টাকা বেতন। এরপরও সবাই আমার ওপর নির্ভরশীল। জানি না এক পা নিয়ে কীভাবে পুরো পরিবারের ভার বহন করব।’
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচার হলেও পারভেজের অবস্থা এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়। পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক আবদুল গণি মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, পচন ধরায় অস্ত্রোপচার করে পারভেজের হাঁটুর নিচের অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। ওপরের অংশেও পচন আছে। অবস্থা খারাপ হলে আরও কাটা লাগতে পারে।
পারভেজকে নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনে কৃত্রিম পা লাগানোর ব্যবস্থা করবে তারা। সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘পারভেজের পুনর্বাসন পুলিশ বাহিনীতেই করা হবে। তাঁর কম্পিউটারে দক্ষতা ভালো। প্রয়োজনে সে দায়িত্ব দেওয়া হবে তাঁকে।’