অপরাধীরাই পুলিশের সভায় আলোচক

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে রাজধানীর থানায় থানায় ‘ওপেন হাউস ডে’ বা ‘উন্মুক্ত দিবসে’ আলোচনা সভা চালু করেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। অরাজনৈতিক এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ব্যক্তিদের এ সভায় ডাকা হতো। কিন্তু এখন এসব সভায় উপস্থিত থাকছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদকের ব্যবহার ও বখাটেদের উৎপাত নিয়ে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে আলোচনা করতে পারতেন এসব সভায়। এখন এলাকায় যাঁরা এসব অপরাধ করে বেড়ান, তাঁরাই ওপেন হাউস ডেতে আসেন আলোচক হয়ে। কমিউনিটি পুলিশের কমিটিও রাজনৈতিক নেতাদের দখলে চলে গেছে। তা ছাড়া অনেক থানায় নিয়মিত আলোচনাও হয় না।

ডিএমপির কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বর্তমান পরিস্থিতি স্বীকার করে নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ওপেন হাউস ডে যেভাবে শুরু হয়েছিল, সেই অবস্থা এখন আর নেই। এর মধ্যে যদি চামচা শ্রেণির লোক ঢুকে পড়ে, তাহলে এটি হবে অসাধুতা ও নিয়মের লঙ্ঘন। তিনি মনে করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী এবং পরিচ্ছন্ন মানুষদেরই ওপেন হাউস ডের আলোচনায় ডাকা উচিত।

তবে একাধিক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) প্রথম আলোকে বলেন, ওপেন হাউস ডের কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য লোক পাওয়া যায় না। সে কারণে যাঁরা থানায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন, তাঁদের কমিটিতে যুক্ত করা হয়।

২০০৭ সালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উদ্যোগে ওপেন হাউস ডে চালু হয়েছিল। তখন ঢাকার পুলিশ কমিশনার ছিলেন নাইম আহমেদ। এর লক্ষ্য ছিল, বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এলাকার মানুষের সঙ্গে পুলিশের এক হয়ে কাজ করা। এ জন্য মাসের নির্ধারিত দিনে থানায় থানায় এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা সভা হতো। সেখানে এলাকার লোকজন তাঁদের সমস্যার কথা তুলে ধরতেন। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন।

>

চাঁদাবাজি, বখাটেদের উৎপাত নিয়ে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে আলোচনা করতে পারতেন
যাঁরা অপরাধ করে বেড়ান, তাঁরাই ওপেন হাউস ডেতে আলোচক

রাজধানীর কয়েকটি থানায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আগের তালিকা বাতিল করে বর্তমানে প্রায় সব থানাতেই ওপেন হাউস ডের জন্য নতুন তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু এতে সাধারণ মানুষের কোনো ঠাঁই নেই। যাঁদের সদস্য করা হয়েছে, তাঁরা প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থক।

গত ১২ মে মিরপুর থানায় ওপেন হাউস ডেতে অংশ নেন ওয়াহিদুজ্জামান নামের মিরপুরের এক বাসিন্দা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ওই দিন মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনারের সভাপতিত্বে ২২ জন আলোচনা করেন। তাঁদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সদস্য। মিরপুর থানার ওসি দাদন ফকির প্রথম আলোকে বলেন, এই সভার কার্যক্রম অনেকটা কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। সভা আর আগের মতো হয় না।
পল্লবী থানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বছরখানেক ধরে সেখানে সভা হয় না। এর বদলে পুলিশ উঠান বৈঠক নিয়ে বেশি ব্যস্ত।

রাজধানীর শ্যামপুর থানায় সর্বশেষ ওপেন হাউস ডের আলোচনা হয় মে মাসে। এতে অংশ নেওয়া ২০ জনের মধ্যে ১৬ জনই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন, ৯০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি লিয়াকত আলী, ৯০ নম্বর ওয়ার্ড বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি সিরাজুল হক তালুকদার প্রমুখ।

তোফাজ্জল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আগে মাদকের ব্যবহারসহ স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলে প্রতিকার পাওয়া যেত। এখন আলোচনা হয়, কিন্তু প্রতিকার মেলে কম।

ওপেন হাউস ডের প্রবক্তা ঢাকার সাবেক পুলিশ কমিশনার নাইম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ওপেন হাউস ডে চালুর উদ্দেশ্যই ছিল থানাকে উন্মুক্ত করে দেওয়া। যখন এটা চালু হয়েছিল, তখন এর দারুণ সফলতাও পাওয়া গিয়েছিল।