কলেজছাত্রের হাত বিচ্ছিন্ন, প্রথম আলোর শনাক্ত বাসটিই জব্দ করল পুলিশ

রাজশাহী নগরের শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান বাস টার্মিনালে বাসটি রাখা ছিল। গতকাল শনিবার বিকেলে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বাসটির ছবি তুলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে আহত কলেজছাত্র ফিরোজ সরদারকে দেখানো হয়। তিনি বাসটি শনাক্ত করেন। তিনি বলেন, এই বাসেই তিনি নন্দীগ্রাম থেকে উঠেছিলেন। বাসটির নাম মোহাম্মদ।
গতকাল শনিবার এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হয়। পুলিশ ওই দিন রাতেই বাসটি ওই টার্মিনাল থেকে জব্দ করে। আজ রোববার সকালে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র সহকারী উপকমিশনার সদর (এডিসি) রুহুল কুদ্দুস সাংবাদিকদের খুদে বার্তা পাঠিয়ে বাসটি জব্দের খবর জানান। তিনিও জানান, বাসটির নাম মোহাম্মদ।
গতকাল বিকেলে ফিরোজের বাবা মাহফুজ আর রহমান বাদী হয়ে নগরের কাটাখালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় আসামি হিসেবে কারও নাম দেওয়া হয়নি। পুলিশ তখন পর্যন্ত গাড়ি শনাক্ত করতে পারেনি। তবে গতকাল ফিরোজ সরদার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, যে গাড়িতে তিনি আসছিলেন, সেটির ইংরেজিতে নামের প্রথম দুই অক্ষর ‘এম, ও’ তাঁর মনে আছে। এ ছাড়া গাড়িতে ওঠার সময় খেয়াল করেছিলেন গাড়ির সামনের কাচ ছিল ফাটা। আর গাড়ির দরজার সঙ্গে যে জানালা থাকে তার একটিতে কোনো কাচ ছিল না। ফিরোজ জানান, নন্দীগ্রামে বাসে ওঠার সময় চেইন মাস্টার তাঁকে জানিয়েছিলেন, গাড়িটি বগুড়া থেকে আসছিল।
গতকাল সকাল থেকেই রাজশাহীতে ছড়িয়ে পড়ে ‘মোহাম্মদ’ নামের গাড়িতেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। গতকাল দুপুরে মোহাম্মদ নামের গাড়িটিকে রাজশাহী নগরের শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান বাস টার্মিনালের পশ্চিম পাশে দেখা গেছে। গাড়ির কোনো লোক পাওয়া যায়নি। টার্মিনালের লোকজন জানিয়েছেন, বগুড়া-রাজশাহীর মধ্যে চলাচলকারী বাসের এই টার্মিনালে রাখার কথা নয়। এই গাড়ি ট্রিপ শেষে নগরের নওদাপাড়া টার্মিনালে এনে রাখা হয়। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, ঝামেলা এড়াতে বাসটিকে এই টার্মিনালে রাখা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই বাসের মালিক সেরেকুল হাজি। কথা বলার জন্য সেরেকুলের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে গতকাল দুপুর থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ফোনটি বন্ধই পাওয়া যায়।
এই গাড়ির ছবি তুলে নিয়ে গিয়ে হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন ফিরোজকে দেখালে তিনি গাড়িটি শনাক্ত করেন। তিনি বলেন, এই গাড়িতেই তিনি গত শুক্রবার নন্দীগ্রাম থেকে উঠেছিলেন।

ফিরোজ বলেন, আসার পথে নাটোর পর্যন্ত বাসটি অনেক জায়গায় থেমেছে আর দেরি করেছে। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা সদর পার হওয়ার পর বাসের গতি বাড়তে থাকে। পুঠিয়ার বেলপুকুর থেকে খুবই বেপরোয়া গতিতে চলছিল। দুটি গাড়ির চালকের দোষে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই দুই চালকের শাস্তি চান তিনি।
ফিরোজ আরও জানান, তিনি বাসের একেবারে শেষের সিটে বসে ছিলেন। ডান হাত দিয়ে তিনি জানালার ভেতর দিয়েই সামনের সিট ধরে ছিলেন। হঠাৎ একটা ঝাঁকুনিতে তার হাত সিট থেকে আলাদা হয়ে জানালার বাইরে চলে যায়। তখনই বিকট শব্দে পাশের গাড়ির সঙ্গে বাসটি ধাক্কা খায়। এতে চাপা পড়ে তাঁর হাত কেটে পড়ে যায়। হাত কেটে যাওয়ার পরও হাসপাতাল আসা পর্যন্ত তাঁর জ্ঞান ছিল। কিন্তু যে গাড়ির সঙ্গে চাপা লেগে তাঁর হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সেটি তিনি চিনতে পারেননি।
দুই বাসের ধাক্কায় হাত বিচ্ছিন্ন হওয়া রাজশাহী কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ফিরোজ সরদার বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসক বলছেন, কোনো ইনফেকশন না হলে তিনি শঙ্কামুক্ত। এ ঘটনার শাস্তির দাবিতে তাঁর কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছেন। তাঁর বাবা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। রোববার তাঁর মাস্টার্সের পরীক্ষা ছিল। তিনি সেই পরীক্ষা দিতে পারলেন না।
নগরীর কাটাখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিবারণ চন্দ্র বর্মণ জানিয়েছেন, ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার একটি ফুটেজ দেখে মোহাম্মদ পরিবহনের চালককেও শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁর নাম মো. ফারুক। বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়ায়। এই চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করা গেলেই জানা যাবে, কোন গাড়ির সঙ্গে তাঁর বাসের চাপা লেগেছিল। ফারুক তা নিশ্চয় জানেন।