ঢাকার পর চট্টগ্রামেও বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

ঢাকার পর চট্টগ্রামেও প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। ঢাকা থেকে এসে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রামে বসবাসকারীরাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডেঙ্গু রোগী বাড়লেও ‘মশকনিধন’ এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান সে অর্থে চোখে পড়ছে না।

তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার থেকে এই দুই হাসপাতালে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা হবে। এ ছাড়া চমেক হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু ব্লক করা হয়েছে।

বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

গতকাল সোমবার এক দিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এই মৌসুমে এক দিনে এত ডেঙ্গু রোগী আর ভর্তি হননি। এ নিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৫ জনে।

চমেক হাসপাতালে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ১৫ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাও রয়েছেন। তাঁরা এর মধ্যে ঢাকায় যাননি।

সরেজমিনে দেখা যায়, চমেক হাসপাতালের তিনটি মেডিসিন বিভাগে ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডে মশারি টাঙিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

নগরের হাজারি লেনের বাসিন্দা প্রিয়ন্তী দেব (১৩) নামে এক কিশোরী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চমেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া হাটহাজারী থেকে নাসিমা আক্তার (২৫) নামে অপর এক নারীও ভর্তি হয়েছেন। দুজনের কেউ ঢাকায় যাননি।

হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, জুলাই মাসে মোট ৬১ জন ডেঙ্গু রোগী চমেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ জন ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন। বর্তমানে ৩৭ জন ভর্তি রয়েছেন।

এ ছাড়া গতকাল নতুন করে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১ জন, আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে ৬ জন, সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতালে ৩ জন, মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে ৯ জন, ন্যাশনাল হাসপাতালে ২ জন, ম্যাক্স হাসপাতালে ১ জন, রয়েল হাসপাতালে ১ জন, সিএসসিআরে ১ জন, পিপলস হাসপাতালে ১ জন, পার্কভিউতে ১ জন এবং মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ৩ জন নতুন রোগী পাওয়া গেছে।

সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ঢাকায় ঘুরে আসা লোকজনের পাশাপাশি স্থানীয় অনেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া রাঙামাটিতে ১ জন, খাগড়াছড়িতে ৪ জন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে।

মশা মারে কখন?

নগরের চকবাজার ওয়ার্ডের কাতালগঞ্জ মোড়ের পাশের নালা ময়লা-আবর্জনায় ভর্তি। নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। এই নালা মশার প্রজননস্থলে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করছেন নালার পাশে ভাসমান চায়ের দোকানি মোহাম্মদ হোসেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় মশা মারার কথা শুনছেন। কিন্তু তাঁদের ওখানে এখন পর্যন্ত মশা মারতে করপোরেশনের কাউকে দেখেননি।

ওই দোকানে চা খেতে খেতে পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা অসীম দে বলেন, তাঁদের এলাকায়ও একই অবস্থা। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মশা মারতে দেখেননি তাঁরা।

নগরের শুলকবহর ওয়ার্ডের আবদুল লতিফ সড়কের দোকানি রাসেল হোসেন বলেন, গত বছর একবার মশা মারতে এসেছিলেন করপোরেশনের লোকজন। এ বছর এখনো কাউকে দেখেননি।

একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা গৃহিণী রুবি দাশ বলেন, মশার যন্ত্রণায় বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না। দুটি কয়েল জ্বালিয়েও রক্ষা পাওয়া যায় না।

বহদ্দারহাটের কালারপুল এলাকার দোকানি মো. করিম ও জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তাঁরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে থাকেন। মশার উৎপাতে দোকানে বসা কষ্ট হয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা মশার ওষুধ ছিটাতে না দেখলেও মশকনিধন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে চলছে বলে দাবি করেছেন সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তারা।

শুলকবহর ওয়ার্ডের আবদুল লতিফ রোডের মশার ওষুধ ছিটানোর দায়িত্বে থাকা প্রকাশ দে বলেন, এখনো ওই এলাকায় ওষুধ ছিটানোর কর্মসূচি নেই। তিনি খুলশী এলাকায় ওষুধ দিয়েছেন।

করপোরেশন সূত্র জানায়, মশকনিধন কার্যক্রমের আওতায় ১৬৩ জন স্প্রে ম্যান রয়েছেন। তাঁদের সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। মশার লার্ভা মারার জন্য লার্ভিসাইড কেনা হয়েছে ১০ হাজার লিটার এবং মশা মারার জন্য কেনা হয় ২৫ হাজার এডাল্টিসাইড। প্রত্যেক কর্মী প্রতিদিন ১৫ লিটার এডাল্টিসাইড ব্যবহার করেন। আর লার্ভা মারতে পানিতে ৮০ মিলিলিটার লার্ভিসাইড মিশিয়ে নালা-নর্দমায় ছিটানো হয়।

সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের নেতৃত্বে প্রতিটি এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। মাসব্যাপী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় ওষুধ ছিটানো হবে। কোনো এলাকা বাদ যাবে না।

কিছু উদ্যোগ

ডেঙ্গু রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নড়েচড়ে বসেছে সংস্থাগুলো। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালে গত রোববার ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট বা রাসায়নিক পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। চমেক হাসপাতালেও আজ থেকে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা যাবে। গতকাল এ জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কিট পাঠানো হয়েছে।

এ ছাড়া সিটি করপোরেশন বিনা মূল্যে ডেঙ্গু রোগের পরীক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে। গতকাল থেকে সদরঘাট সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতালে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এদিকে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গতকাল নগরের বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়।

সিভিল সার্জন বলেন, সবগুলো হাসপাতালকে চিঠি দেওয়া হয়েছে ডেঙ্গু রোগীর খবর জানানোর জন্য। ব্যক্তিগতভাবে যাঁরা বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাঁদের বিষয়টি জানা সম্ভব নয়।