মাছ চাষে বিপ্লব

শ্রীপুরের ভিটিপাড়া এলাকায় মাছ ধরায় ব্যস্ত চাষিরা। সম্প্রতি তোলা।  ছবি: সাদিক মৃধা
শ্রীপুরের ভিটিপাড়া এলাকায় মাছ ধরায় ব্যস্ত চাষিরা। সম্প্রতি তোলা। ছবি: সাদিক মৃধা

শিল্পশহর গাজীপুর তথা শ্রীপুরের প্রায় সর্বত্র দেখা মেলে তৈরি পোশাক কারখানার। তবে এই শিল্পের ভিড়ে আরেকটি খাতের প্রসার ঘটছে, তা হলো মৎস্য। এই শিল্পাঞ্চলের মহাসড়ককেন্দ্রিক এলাকাগুলো ব্যাপক শিল্পায়নের আওতায় এলেও অপেক্ষাকৃত কিছুটা প্রত্যন্ত এলাকার বিস্তীর্ণ জলরাশি এখনো মাছে পরিপূর্ণ; যদিও এগুলোর বেশির ভাগই কৃত্রিম জলাশয়।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ভিটিপাড়া সবুজ–শ্যামল গ্রাম। এর আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা জলাশয়গুলো দেখলে বোঝার উপায় নেই, এটি কোনো শিল্প–অধ্যুষিত এলাকা। ব্যক্তিপর্যায়ে এই গ্রামের বিভিন্ন স্থানে চলছে মাছের আবাদ। এটি শুরু হয়েছে কয়েক যুগ আগে। ভিটিপাড়া গ্রামের মৎস্যজীবীদের মধ্যে একজন ৩৮ বছর বয়সী আবু তালেব। তিনি প্রায় দুই যুগ ধরে মাছ চাষে জড়িত। তাঁর মতো এই গ্রামে আরও অনেক মৎস্যজীবী আছেন। তাঁরা কেউ কেউ নিজের জমিতে, আবার কেউ অন্যের জমি চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে মাছ চাষ করছেন। এসব মৎস্য চাষ প্রকল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রচুর বেকার লোকজনের। শ্রীপুরের মোট মৎস্য উৎপাদনের বেশির ভাগ এখানেই উৎপাদিত। সম্প্রতি ভিটিপাড়া গ্রামের দিকে যেতে যেতে পথে দেখা গেল অর্ধশতাধিক ছোট-বড় জলাশয়। এগুলোর কয়েকটিতে দেখা গেছে, পানকৌড়ি, কানি বকের দল মাছ ধরছে। কয়েকটিতে চাষিরা মাছকে খাবার দিচ্ছেন ছোট নৌকায় করে। বড়সড় পুকুরের মাঝখানে স্থানে স্থানে দৃষ্টিনন্দন ছাউনিসহ মাচা পাতা। সেখানে বসে আছেন কয়েকজন। তাঁরা মাছের বিষয়ে যাবতীয় খোঁজ রাখছেন। ভিটিপাড়া পৌঁছালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল একটি জলাশয়ে মাছ ধরতে ব্যস্ত গ্রামের ১০-১২ জন। বড়সড় জাল ফেলে তা টেনে ক্রমান্বয়ে জলাশয়ের তীরে নিয়ে আসছেন তাঁরা। পাড়ে অপেক্ষা করছেন মাছের প্রকল্পটির স্বত্বাধিকারী আবু তালেব। 

মাছ চাষে যুক্ত হওয়া ও এর আদ্যোপান্ত জানালেন ভিটিপাড়া গ্রামের এই মৎস্যজীবী। বললেন মাছ চাষে যুক্ত হওয়ার শুরুর কথা। গ্রাম এলাকায় কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় ১৯৯৪ সালে কিছু একটা করার পরিকল্পনা করেন তিনি। তখন আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কয়েকজন মাছ চাষে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের কাছে এ বিষয়ে পরামর্শ করে নিজের জমির কিছু অংশ খনন করে মাছ চাষের উপযোগী করেন। স্থানীয় মৎস্য কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেন পরামর্শ। প্রথম বছরই লাভের মুখ দেখলেন। উৎসাহিত হলেন। বাড়িয়ে নিলেন পুকুরের সংখ্যা। এভাবে ছোট ছোট সফলতা তাঁকে এতটাই উৎসাহিত করল যে ২০১৯ সালে একক ও যৌথ মালিকানা মিলিয়ে এখন তাঁর মাছে চাষ হচ্ছে প্রায় ১২০ বিঘা জলাশয়ে। নিজের আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন অনেকের। এখন তাঁর মাছের ফিশারিতে আছে মিনার কার্প, তেলাপিয়া, রুই, কাতল, পাঙাশ, সরপুঁটি, মৃগেল, কালবাউশসহ নানা প্রজাতির মাছ।

মাছ চাষে সফলতার গল্প শোনালেন একই গ্রামের কিবরিয়া সরকার। তিনিও বললেন তাঁর মাছ চাষের এক যুগের অভিজ্ঞতার কথা। জানালেন, যাঁর একটু জমি আছে, তিনিই এই পেশায় আসতে পারেন। জমি না থাকলেও সমস্যা নেই। খুব অল্প টাকায় নিচু জমি ভাড়া নিয়েও মাছ চাষ শুরু করতে পারেন। ভাড়া ও নিজস্ব মিলিয়ে তাঁর মাছ চাষ হচ্ছে ১২ বিঘা জলাশয়ে। মাছ চাষে সফলতা পেয়েছেন এই গ্রামের মো. কয়েশ, রেজাউল করিমসহ আরও বেশ কয়েকজন। তাঁদের সবাই লাভের পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পেরে খুশি। 

শ্রীপুর উপজেলার মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এখানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে পুকুরের সংখ্যা ৪ হাজার ৩৫৯। বিল ১৪৫টি। খাল চারটি। মাছচাষির সংখ্যা ১ হাজার ৬৮৫। মৎস্যজীবী আছেন ৬০৮ জন। মৎস্যজীবী সমিতি ১৮টি। সরকারি-বেসরকারি হ্যাচারি আছে ৩টি। বছরে এখানে ১০ হাজার ৯৭৫ মেট্রিক টন মাছের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১১ হাজার ২০৩ মেট্রিক টন।

শ্রীপুর উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা বদিউজ্জামান বলেন, শ্রীপুরে শিল্পের ভিড়ে মাছ চাষ হচ্ছে—এটা একটা বড় সুসংবাদ। আরও সুসংবাদ হলো এখানে চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন অনেক বেশি। এমন শিল্প এলাকায় মাছ উৎপাদন অনেক এলাকার জন্য উদাহরণ হতে পারে। তিনি বলেন, শ্রীপুরে অনেক প্রাকৃতিক জলাশয়ের পানিদূষণের কারণে মাছ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে উৎপাদন আরও বাড়বে।