একটি অংশ ভোগবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে: দুদক কমিশনার

সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল পরিকল্পনা বাস্তবায়নবিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছেন সংস্থাটির কমিশনার (তদন্ত) এ এফ এম আমিনুল ইসলাম। ছবি: দুদকের সৌজন্যে।
সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল পরিকল্পনা বাস্তবায়নবিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছেন সংস্থাটির কমিশনার (তদন্ত) এ এফ এম আমিনুল ইসলাম। ছবি: দুদকের সৌজন্যে।

যেকোনো মূল্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সবার অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া জরুরি বলে মনে করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার (তদন্ত) এ এফ এম আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলসহ বহুমাত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, সংসদেও বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এসবের মাধ্যমেই দুদক, সরকার, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমসহ সবার সমন্বিত ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

আজ শনিবার সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল পরিকল্পনা বাস্তবায়নবিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রশিক্ষণে কমিশনের উপপরিচালক ও পরিচালক পদমর্যাদার ৭০ জন কর্মকর্তা অংশ নিচ্ছেন।

দুদক কমিশনার বলেন, অপ্রিয় হলেও সত্য সমাজের একটি অংশ ভোগবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে, পারিবারিক বন্ধন ধীরে ধীরে শিথিল হচ্ছে। পরিবার থেকে নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। পরিবারের পরেই মহান শিক্ষক তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। সেখানেও মানসম্মত শিক্ষা এবং উত্তম চর্চার বিকাশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের যেভাবে আত্মনিয়োগ করার কথা, কিন্তু কিছু শিক্ষক সেভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না।

তিনি বলেন, এ পর্যন্ত দুদক ১৩০টিরও বেশি গণশুনানি করেছে। আমি তৃণমূল পর্যায়ে অধিকাংশ গণশুনানিতে উপস্থিত থেকেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে শতাধিক বিদ্যালয় ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেছি, ‘শিক্ষার্থী উপস্থিত আছে, কিন্তু কতিপয় সম্মানিত শ্রেণি শিক্ষক আসেননি। তিনি হয়তো কোচিং বা অন্য কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। বিষয়গুলো স্থানীয় শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের জানিয়েছি।’ ছাত্ররা বলেছে, শিক্ষকেরা কোচিং নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এই কোচিং–বাণিজ্য নিয়ে কমিশন থেকে কিছু ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন।

আমিনুল ইসলাম বলেন, একদিন এক হাসপাতালে গিয়ে জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসকের চেয়ারে একজন কম্পাউন্ডারকে পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক হাসপাতালে আসেননি, কম্পাউন্ডার চিকিৎসক সেজে চিকিৎসকের চেয়ারে বসে আছেন। প্রথমে আমিও বুঝতে পারিনি। পরে কথাবার্তা বলার পরে বুঝতে পারলাম উনি চিকিৎসক নন। বিষয়টি সিভিল সার্জনকে জানিয়েছি, তিনি হয়তো প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, গণশুনানিতে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ জিআর, টিআর, টাকিখা ও কাবিখার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ করে। অনেকেই বলেন, এগুলোর সঠিক ব্যবহার হলে গ্রামের চেহারার দৃশ্যমান পরিবর্তন হতো।

দুদক কমিশনার বলেন, ওভার-ইনভয়েসিং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং ও রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে ব্যবসায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদকের সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করা সমীচীন। কারণ, কমিশনে এ–সংক্রান্ত অনেক অভিযোগ আসে। এ বিষয়ে বেশ কিছু মামলাও করা হয়েছে। এ জাতীয় ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধের জন্যই সমন্বয়ের প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে এসিল্যান্ড অফিস, ভূমি অধিগ্রহণ অফিস ও সেটেলমেন্ট অফিসের প্রতি মানুষের একসময় আস্থা ছিল। এখন অফিসগুলোর প্রতি তৃণমূলের মানুষের ব্যাপক হতাশ। এমনকি গণশুনানিতে এসব অফিসের কর্মকর্তারা অভিযোগকারীদের সঙ্গে কর্কশ ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করেন।

দুদক কমিশনার আরও বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের নিজস্ব শুদ্ধাচার নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন। তবে আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, বিগত সাড়ে তিন বছরে এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নৈতিক মানের প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে। কমিশন প্রতিটি নথি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, নথি দেখেই নৈতিকতার মানদণ্ড বোঝা যায়।
এরপর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

এ সময় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এন এম জিয়াউল আলম বলেন, শুদ্ধাচার বিকাশে সরকার তথ্য অধিকার আইন, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা) আইন, মানি লন্ডারিং আইনসহ বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেছে। পাশাপাশি সরকারি পরিষেবা তৃণমূল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন দুদকের মহাপরিচালক (প্রশিক্ষণ ও আইসিটি) এ কে এম সোহেল, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব সাদিয়া আফরিন প্রমুখ।