মানব পাচার মামলার বিচার হয় না

কক্সবাজারের রামু উপজেলার এক নারীকে নেপালে ভালো চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দিয়েছিল মানব পাচারকারীরা। ২০১৪ সালের আগস্টে তাঁদের খপ্পরে পড়ে ওই নারীর ঠাঁই হয় খুলনার একটি যৌনপল্লিতে। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। পাঁচ মাস পর ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিন মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে রামু থানায় একটি মামলা করে মেয়ের পরিবার।
ওই বছরের অক্টোবরে তিনজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছিল পুলিশ। এখন পর্যন্ত বিচার দূরে থাক, আসামিদের কেউ ধরা পড়েননি। এটির মতো কক্সবাজারের ৬২১টি মানব পাচার মামলার বিচারকাজ এখনো চলমান। বিচারকাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে মানব পাচারকারী ও তাঁদের নিয়োজিত দালালেরা। আর পাচারের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলো রয়েছে দুর্বিষহ যন্ত্রণায়।
আইনজীবী, মানবাধিকার ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূল দিয়ে একের পর এক মানব পাচারের ঘটনা ঘটছে। কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার সাগর উপকূল সন্ধ্যার পর অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এ সময় বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মানব পাচারের ঘটনা ঘটলেও প্রতিরোধব্যবস্থা নেই।
মূলত শীত মৌসুমে সাগর শান্ত থাকার সুযোগে মানব পাচারকারীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। বর্তমানে তাদের মূল্য লক্ষ্য হচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। ছেলেদের চাকরি ও মেয়েদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের চেষ্টা করা হয়।
বিচার শেষ হয়নি ৬২১ মামলার
কক্সবাজার আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে মানব পাচার আইন হওয়ার পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজারে ৬৩৭টি মামলা হয়েছে।
এর মধ্যে জেলার ৮টি থানায় ৪৬৭টি ও ট্রাইব্যুনালে হয়েছে ১৭০টি।
বর্তমানে তিনটি পৃথক ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে ৬২১টি। এর মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারাধীন মামলা ৩১৮টি, ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলা ৫২টি এবং ট্রাইব্যুনাল-৩-এ বিচারাধীন ২৫১টি মামলা। বাকি ১৬টি মামলা খারিজ করে দেওয়া হয়।
>২০১২ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬২১টি মামলার একটিরও বিচার হয়নি। থামছে না পাচার।
বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) সাকি-এ কাউসার। তিনি জানান, গতকাল পর্যন্ত ৬২১ মামলার একটিরও বিচারকাজ শেষ হয়নি।
কক্সবাজার আদালতের পিপি ফরিদুল আলম বলেন, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ২১(২) ধারা অনুযায়ী, অপরাধসমূহ বিচারের জন্য দায়রা জজ কিংবা অতিরিক্ত জজ পদমর্যাদার বিচারকের সমন্বয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো জেলায় ট্রাইব্যুনাল হয়নি। এ ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা।
‘টার্গেট’ রোহিঙ্গারা
কক্সবাজারের এনজিও নোঙর দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের মানব পাচারের মামলা নিয়ে কাজ করছে। নোঙরের কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ৬০০ নারী-শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তাদের অধিকাংশ রোহিঙ্গা। মালয়েশিয়ায় ভালো চাকরি ও বিয়ের প্রলোভন দিয়ে দালালেরা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরদের পাচার করছে। পরবর্তী সময়ে মেয়েদের বিক্রি করে দিচ্ছে যৌনপল্লিতে। শিশুদের দিয়ে খাটানো হচ্ছে অবৈধ শ্রম।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, মানব পাচারকারীদের প্রধান ‘টার্গেট’ এখন রোহিঙ্গা মেয়ে ও শিশুরা। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে মানব পাচারে সক্রিয় রয়েছে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা দালাল। তারাই নানা প্রলোভনে ফেলে রোহিঙ্গা মেয়ে ও শিশুদের শিবির থেকে বের করে দেশীয় দালালের কাছে বিক্রি করছে।
নোঙরের নির্বাহী পরিচালক দিদারুল আলম বলেন, ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার থেকে এক লাখের বেশি লোক পাচার হয়েছে। পাচারের শিকার পরিবারগুলোর সদস্যরা ভোগান্তি ও সমস্যার মধ্যে দিন যাপন করছে। কিন্তু পাচারকারী ও দালালেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে মানব পাচার থামছে না।
থেমে নেই মানব পাচার
নোঙরের তথ্যমতে, ২০১২ সালের পর থেকে কক্সবাজারে মানব পাচার বেড়ে গেছে। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে গণকবর আবিষ্কৃত হয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মানব পাচার বন্ধ ছিল। ২০১৯ সালের শুরু থেকে সমুদ্রপথে মানব পাচার পুনরায় শুরু হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গত বছর কক্সবাজারের মহেশখালী, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া ও সেন্ট মার্টিন এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ৩৩ দফায় ৭৯৬ রোহিঙ্গা ও ২ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে। এ সময় ২৯ দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় সাত মানব পাচারকারী, তাদের মধ্যে তিনজন ছিল রোহিঙ্গা।
চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি রাতে টেকনাফের বাহারছড়া উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর সময় ২৩ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় সঙ্গে থাকা কয়েক দালাল পালিয়ে যায়।
বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলী বলেন, মাথাপিছু ২০-২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে দালাল চক্র ১৮ নারীসহ ২৩ রোহিঙ্গাকে উখিয়ার বিভিন্ন আশ্রয়শিবির থেকে উপকূলে নিয়ে আসে। তাদের সাত তরুণীকে মালয়েশিয়াতে বিয়ের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল।
গত বছরের ২৪ নভেম্বর মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপের মগচর থেকে পুলিশ উদ্ধার করে আরও ২৫ রোহিঙ্গাকে। ১৫ নভেম্বর উখিয়ার সোনারপাড়া উপকূল থেকে পুলিশ উদ্ধার করে আরও ১১ রোহিঙ্গাকে। তাদের মধ্যে পাঁচজন তরুণী।
জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, উপকূলের স্থলভাগে পুলিশসহ একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। কিন্তু সাগর কিছুটা অরক্ষিত। সেখানে ট্রলার নিয়ে কাউকে পাচার করলে পুলিশের করার কিছু থাকে না। এ ব্যাপারে সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোকে তৎপরতা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।