মানুষকে ঘরে রাখা কঠিন, হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা এবং লকডাউন (অবরুদ্ধ) কার্যকর করার মাধ্যমে সারা দেশে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে মাঠ প্রশাসন। এ ক্ষেত্রে রাজধানীসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর চিত্র কিছুটা সন্তোষজনক হলেও জেলা শহর ও গ্রামের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সেখানে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আছে, সচেতনতা কম। গ্রামের মানুষের মধ্যে ঘরের বাইরে থাকার প্রবণতা বেশি। দেশের অনেক জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে এ ধারণা পাওয়া গেছে।
একাধিক জেলা প্রশাসক প্রথম আলোকে বলেছেন, বিদ্যমান জনবল দিয়ে তাঁরা মাঠপর্যায়ে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে পারছেন না। পুলিশ ছাড়াও বিজিবি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করার পক্ষে মত দিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের কঠোর নির্দেশনা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।
জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে নারায়ণগঞ্জ জেলা, যেখানে ১ কোটির বেশি মানুষের বসবাস। ওই জেলার মানুষ নিজ গ্রামে গিয়েছেও কম, আবার যারা গিয়েছে তাদের অনেকেই ফিরে এসেছে। ফিরে আসা প্রবাসী শ্রমিক, তাবলিগ জামাত, শ্রমঘন শিল্পসহ নানা কারণে এই জেলাকে করোনা বিস্তারের ‘হটস্পট’ ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জও করোনা সংক্রমণের বড় ঝুঁকিতে আছে। আর সবচেয়ে বেশি স্পর্শকাতর জেলা এখন কক্সবাজার, সেখানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করছে ১২ লাখের বেশি মানুষ।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে আমরা আরও কঠোর হব। জেল–জরিমানা ছাড়াও প্রয়োজনে অন্যান্য দেশ যেসব পদ্ধতি কার্যকর করে দূরত্ব বজায় রাখছে, আমরাও তা প্রয়োগ করব। না পারলে তো শেষ পর্যন্ত আরও সেনা মোতায়েন করতে হবে।’
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, করোনা সংক্রমণ রোধে অলিগলিতে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। পোশাকশ্রমিকসহ ১ কোটি মানুষ নারায়ণগঞ্জে আছে। এদের কেউ কেউ গ্রামের বাড়িতে যায়নি। কেউ কেউ গিয়ে ফিরে এসেছে। ছোট এক কক্ষে ৮-১০ জন করে থাকে। বেশিক্ষণ তাই ঘরে আটকে থাকতে পারে না। এদের বেতনও হয়নি। এ ছাড়া এখনো প্রতিদিন পাইকারি বাজারে ১০ হাজার লোক কাজ করে। এ এলাকায় ফিরে আসা প্রবাসীর সংখ্যা ১০ হাজার।
যশোরের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, সেখানে এখন পর্যন্ত করোনা রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে জেলা পুলিশকে কাজ করতে গিয়ে অনেক ধরনের প্রতিকূলতা, বাধাবিপত্তিতে পড়তে হচ্ছে। লুকোচুরি খেলার মতো অবস্থা—পুলিশি টহল চলাকালীন বাজারঘাট শূন্য হয়ে যায়। আর পুলিশ চলে গেলেই মানুষ অকারণে আবার ভিড় জমায়। বেনাপোলে বিদেশফেরতদের জন্য কোয়ারেন্টিন সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে স্থানীয় জনগণ রাস্তায় ইটবালু ফেলে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। অতি নিম্নমধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তদের খাদ্যসংকটসহ নানা অভাব-আপত্তির কারণে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের বিব্রত হতে হচ্ছে। রাতদিন অসংখ্য ফোনে অভিযোগ আসে যে, তাদের এলাকায় বিদেশ থেকে বা ঢাকা থেকে লোক এসেছেন, তাঁরা ঘরে না থেকে বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন, পুলিশ যাতে ব্যবস্থা নেয়। পুলিশ গেলে লোকগুলো ঘরে ঢুকে যান, আবার পরক্ষণই নাকি বের হয়ে আসেন।
পাবনার ১১টি উপজেলায় ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে লোকজন এসেছে। এদের নিয়ে প্রশাসন চিন্তিত বলে জানালেন পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম।
চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম বলেন, সারা দিন সামাল দিতে পারলেও বিকেলে মানুষ বের হয়ে আসে। তখন আর সামাল দেওয়া যায় না।
সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শত শত পোশাকশ্রমিক ঢাকায় গিয়ে আবার ফিরে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে ৮০০ জনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর থেকে ৩ হাজারের মতো মানুষ সাতক্ষীরা জেলায় এসেছে। এদের মধ্যে ৭৮৪ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে এবং ২ হাজার মানুষকে বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আনসার ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে টহল জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। কিন্তু মানুষ আদেশ, অনুরোধ, নির্দেশ মানছে না। ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে।
গাজীপুরে অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, পোলট্রি ফিড, ফিশ ফিড, ডেইরি ফিড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান চালু আছে। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁদের নিয়মের মধ্যে রাখা দুরূহ বলে জানালেন জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর।
এ ছাড়া কক্সবাজার, ফরিদপুর, বরিশাল, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলা প্রশাসক একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সারা দেশের এমন পরিস্থিতির বিষয়ে একমত পোষণ করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একটি জেলা মানে তো অনেক বড় এলাকা। এত অল্প জনবল দিয়ে সামাল দিতে পারার কথা নয়। জেলা প্রশাসকেরা যদি সুনির্দিষ্টভাবে জানান, চাহিদাপত্র দেন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও সদস্য মোতায়েন করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হবে।