দেশে ৬৫% করোনা রোগীর চিকিৎসা বাড়িতেই

কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত রোগীরা বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, ৬৫ শতাংশের বেশি রোগী বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে জটিল ও একসঙ্গে অনেক রোগ আছে, এমন করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য বড় হাসপাতাল প্রয়োজন।

একই পরিবারের দুজন ভর্তি আছেন রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। তাঁদের একজন প্রথম আলোকে বলেছেন, বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিলে তিনি মানসিকভাবে চাঙা থাকতেন। 

ওই ব্যক্তি আরও জানান, তাঁর পরিবারের আরও চারজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের চিকিৎসা হচ্ছে বাড়িতে। বাড়িতে রেখে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত কে দিয়েছে—এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই ব্যক্তি জানান, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁদের এই পরামর্শ দিয়েছিল। তিনি বলেন, তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়িতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। 

গতকাল বুধবার সকালে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা প্রথম আলোকে বলেন, এই রোগের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। লক্ষণ-উপসর্গ দেখে চিকিৎসা দিতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণ থাকে মৃদু। মৃদু লক্ষণযুক্ত রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই। পরামর্শ মেনে চললে বাড়িতেই চিকিৎসা সম্ভব। 

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, ৪০ শতাংশ রোগীর লক্ষণ থাকে মৃদু। ৪০ শতাংশের লক্ষণ মাঝারি ধরনের জটিলতা। যেখানে নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যায়। ১৫ শতাংশের ক্ষেত্রে সংক্রমণ থাকে তীব্র মাত্রার। বাকি ৫ শতাংশের পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। বিশেষজ্ঞ মতে, এ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির দরকার হয় ৬০ শতাংশের। এঁদের একটি অংশের জন্য প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ)।

৮ মার্চ দেশে প্রথম কোভিড–১৯ রোগী শনাক্ত হয়। এরই মধ্যে গতকাল পর্যন্ত শনাক্ত রোগী ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে। সংক্রমণ পরিস্থিতির চতুর্থ স্তরে আছে দেশ। দেশের ৪৪টি জেলার মানুষের মধ্যে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন তালিকায় নতুন নতুন জেলা যুক্ত হচ্ছে। সংক্রমণ কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউ বলতে পারছে না।

এ পরিস্থিতিতে সরকার রাজধানীতে ৯টি হাসপাতালে কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে আছে কুয়েত–বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মহানগর হাসপাতাল, রেলওয়ে হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি হাসপাতাল, মিরপুর মা ও শিশু হাসপাতাল, বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতাল (উত্তরা ও মিরপুর) ও সাজিদা ফাউন্ডেশন হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ৩৩০। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আইসোলেশন ইউনিট আছে। সেখানেও কিছু রোগী থাকে। আরও কিছু সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল করোনা চিকিৎসার জন্য আওতাভুক্ত করার উদ্যোগ আছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।

>নির্ধারিত কিছু হাসপাতালের জটিল ও বহু রোগী ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা নেই। দরকার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বড় হাসপাতাল।

সরকারের হিসাবে গতকাল মোট ১ হাজার ১৩২ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আমিনুল হাসান বলেন, গতকাল বিকেলে কুয়েত–বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে ১৪২ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ২১৭ জন ও মহানগর হাসপাতালে ২৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র বলেছে, দু–একটি বেসরকারি হাসপাতালে এখন কিছু রোগী ভর্তি আছেন। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ৯ জন ভর্তি। সব মিলিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি ৪০০ জনের মতো। বাকি ৭৩২ জন বা ৬৫ শতাংশ রোগী বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। 

দরকার বড় হাসপাতাল

তবে পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তা সামাল দিতে ছোট হাসপাতালগুলোর সমস্যা হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যেসব হাসপাতালের সাধারণ ও বিশেষায়িত সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা ও জনবল আছে, সেসব হাসপাতালকে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা জরুরি। সময়ক্ষেপণ না করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবতে হবে।

বেশ কিছু জটিল রোগী ও মৃত্যুর ঘটনার পর্যবেক্ষণ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কিছু ব্যক্তি মনে করেন, কোভিড–১৯ চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর মধ্যে দুটি ছাড়া অন্যগুলোতে জটিল রোগী সামাল দেওয়ার মতো অভিজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টের ঘাটতি রয়েছে। 

অন্যদিকে একসঙ্গে বহু রোগী ভর্তি ও ব্যবস্থাপনারও ঘাটতি রয়েছে নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর। ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা, কর্মচারী, ওয়ার্ডবয়, আয়া—তাঁরা বহুবার প্রমাণ দিয়েছেন তাঁরা রোগীর ঢল সামাল দিতে পারেন। কিন্তু এখন যেসব হাসপাতালে চিকিৎসা হচ্ছে তাঁরা তা পারবেন কি না, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। 

এ ব্যাপারে বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম বলেন, একটি ছাড়া নির্ধারিত হাসপাতালগুলো একেবারে নতুন। জটিল রোগী এবং একসঙ্গে বহু রোগী ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা কারও নেই। এখনই বিষয়টিতে নজর দিতে হবে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন কোভিড-১৯–বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির উপদেষ্টা অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বড় ও একই সঙ্গে বহু বিষয়ে চিকিৎসা দেওয়ার যোগ্যতা আছে, এমন হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখতে হবে। সেটা ঢাকা মেডিকেল বা বিএসএমএমইউ হতে পারে। কোনো বেসরকারি বড় হাসপাতালও হতে পারে। 

ব্যবস্থাপনায় সমস্যা

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। গতকাল সকাল ছয়টায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে একজন কোভিড-১৯ রোগীর মৃত্যু হয়। ১২টা পর্যন্ত তাঁর মৃতদেহ হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে সরানো হয়নি। অন্য রোগীদের ভয়ে–আতঙ্কে সময় কেটেছে। 

ওই হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডের একজন রোগী গতকাল বিকেলে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা রোগীর কাছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লোকজনকে খুব একটা আসতে দেখা যায় না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের আটজনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তাঁরা মহাখালীর একটি হাসপাতালের দোতলায় আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি আছেন। গত সাত দিনে ওই ইউনিটে কর্তৃপক্ষের কেউ যাননি বলে জানা গেছে।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিব খান হাবিবুর রহমান গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, সব অভিযোগ হয়তো সঠিক নয়। হাসপাতালগুলোর মধ্যে কী হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা আছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সিসি ক্যামেরা আছে।’ 

বাড়িতে চিকিৎসা

বিএসএমএমইউর একজন চিকিৎসক কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই চিকিৎসক বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

একটি বেসরকারি হাসপাতালের চারজন চিকিৎসকের করোনা শনাক্ত হয়েছে। ওই হাসপাতালের একজন ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তাঁদের সংক্রমণ মারাত্মক নয়। প্রত্যেকে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসক ছাড়া আরও অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন বাড়িতে। 

বাড়িতে চিকিৎসার ব্যাপারে দুই ধরনের মত পাওয়া যাচ্ছে। আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা বলেছেন, সবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরকার নেই। সাধারণ জ্বরের মতোই এটা ভালো হয়ে যায়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শমতো চলতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে পরিবারের অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে। খাওয়া, থাকা, বাথরুম ব্যবহার থেকে শুরু করে সব ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। 

তবে দেশের সমাজব্যবস্থায় বাড়িতে চিকিৎসাব্যবস্থা কার্যকর হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির মহাসচিব অধ্যাপক আহমেদুল কবীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসকের পরামর্শ মানছেন কি না, বাড়ির অন্য সদস্য বা প্রতিবেশীর সঙ্গে মেলামেশা করছেন কি না, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেন না। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে রাখতে হবে। পরিস্থিতির অবনতি হলে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।