
>করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে সবার জীবনের বাস্তবতা। আমরা এখানে শুনছি পাঠকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার কথা। তাঁরা লিখছেন পরিবারের আনন্দ–বেদনাভরা গল্প। শোনাচ্ছেন এ সময়ের কোনো মানবিক সাফল্যের কাহিনি। প্রথম আলো মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে পাঠকের গল্প। দেশ বা প্রবাস থেকে আপনিও লিখুন আপনার অভিজ্ঞতার কথা। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]
আমি ব্যবসা করি। মুদ্রণ ব্যবসা। নিজের প্রিন্টিং মেশিন নেই। গ্রাফিক ডিজাইনের একটা বন্দোবস্ত আছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মাসখানেক আগে থেকেই ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছিল। মার্চের মাঝামাঝি কিছু কাজের প্রস্তাব এল। টাইপ আর ডিজাইন ঠিক করে ছাপতে দিলাম। এর পরে বাঁধাই। সে কাজ শুরু হতে না-হতে চলে এল করোনা। কাজটা করে দিতে পারলাম না, তাই বিলও নেই। আরেকটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে কাজের অর্ডার এল ২৪ মার্চ। আগাম পেলাম ৫০ হাজার টাকা।
এরপর ২৬ মার্চ থেকে টানা বসে আছি বাসায়। ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ। উপার্জন বলতে কিচ্ছু নেই। হাতে আছে শুধু আগাম পাওয়া সেই ৫০ হাজার টাকা। ভদ্রলোক একটা খামে ভরে দিয়েছিলেন। খামসহই আলমারিতে রেখে দিয়েছি। সেখান থেকেই এখন ক্রমাগত খরচ হচ্ছে।
২৪ ঘণ্টা বাসায় থাকি। খুবই একঘেয়ে লাগে। সংসারের টুকিটাকি কাজ করি। বই পড়ি। টিভি আর মুঠোফোন নিয়ে পড়ে থাকি। বিষয় তো একটাই, কোভিড-১৯। দেশ–বিদেশের খবর পড়তে পড়তে হৃদয় ভেঙে যায়। কিন্তু করার কিছু তো নেই। সবারই একই অবস্থা।
মাঝেমধ্যে খামটা বের করে টাকা গুনি আর হিসাব করি। কত দিন চলা যাবে এ টাকায়? কে জানে, করোনা কবে আমাদের মুক্তি দেবে!
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথা খুব মনে পড়ে। আমার বয়স তখন ১৩ বছর। বাবা অবসর নিয়েছেন তার দুই বছর আগে। বড় ভাই পরিবার নিয়ে ময়মনসিংহ শহরে থাকেন। সেখানে তাঁর ইলেকট্রনিকসের দোকান। বাবা অবসর নেওয়ার পর সংসার খরচের জন্য মাকে প্রতি মাসে দেড় শ করে টাকা পাঠান। বাড়িতে মা মুরগি আর ভেড়া পালেন। বাবা বাড়ির সামনে সবজি করেন। ফসলি জমি থেকে আসে ধান, গম, ডাল, শর্ষে। সব মিলিয়ে আমাদের তিনজনের সংসার চলে যায়।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দাদা শুধু একবার বাড়িতে টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন। মে মাসের দিকে সব ফেলে তিনি আশ্রয় নেন ভারত সীমান্তের কাছে হালুয়াঘাট গ্রামে। তারপর থেকে আর টাকা পাঠাতে পারছিলেন না। সংসার কীভাবে চলবে, সেটা ভেবে বাবা খুব ভেঙে পড়লেন। মা অভয় দিয়ে বলতেন, ‘এত ভয় পেয়ো না। আমার কাছে কিছু জমানো টাকা আছে। না খেয়ে মরব না।’
জুলাই মাসের শেষ দিকে আমাদের থানা সদর নবাবগঞ্জে পাকিস্তানি সেনারা এসে নিরীহ মানুষ মারতে লাগল। আগুন লাগিয়ে দিল বাড়িঘরে। মা-বোনদের ধরে নিয়ে গেল ক্যাম্পে। শোনা গেল, ওরা বান্দুরাতেও আসবে। আমাদের গ্রামটা ছিল নিচু। তখন বর্ষা চলছে। নৌকা ছাড়া আমাদের গ্রামে ঢোকার আর কোনো পথ ছিল না। সবার দৃঢ় বিশ্বাস হলো, সাঁতার না জানা পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগোপ্তা আক্রমণের ভয়ে আমাদের গ্রামে আসবে না। তাই বান্দুরা আর তার আশপাশের মানুষ আমাদের গ্রামে এসে আশ্রয় নিল।
আমাদের বাড়িতে এসে উঠল হাসনাবাদের পাঁচ সদস্যের একটি আত্মীয় পরিবার। এবার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন মা। মায়ের জমানো টাকা রুমালে বেঁধে একটা টিনের সুটকেসে তালা দিয়ে রাখা থাকত। মাঝেমধ্যে তিনি সেই টাকা বের করেন আর গোনেন। আর তাঁর উদ্বেগ বাড়তে থাকে। আমার এখন মায়ের মতোই অবস্থা।
ভেবে অবাক লাগে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মা কেমন করে সংসারটা টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। অতিথিসহ কাউকেও একটা দিনও না খেয়ে থাকতে হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয় পেয়েছি। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধেও নিশ্চয়ই জয়ী হব। কিন্তু মাঝখানে আমরা অনেককে হারাব, অনেক কিছু হারাব। তবু সেসবের প্রতিদানে হলেও জয়টা আসুক। দ্রুত আসুক।