জীবিকার জন্য পুরোনো কাজ ছেড়ে নতুন কাজে তাঁরা

চট্টগ্রাম নগরের কাতালগঞ্জের একটি গাড়ি মেরামত কারখানায় (ওয়ার্কশপ) কাজ করতেন মোহাম্মদ হোসেন। করোনার জন্য ঘোষিত সাধারণ ছুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায় তা। হোসেনের চাকরিও চলে যায়। আয়ের পথও বন্ধ। অথচ ঘরে অসুস্থ মা। আবার আছে সংসার খরচ। তাই নিরুপায় হয়ে রিকশা চালানো শুরু করেন তিনি।
করোনার ধাক্কায় পেশা পাল্টানোর এই গল্প শুধু মোহাম্মদ হোসেনের নয়। তাঁর মতো স্বল্প আয়ের অনেকেই জীবিকার তাগিদে বেছে নিয়েছেন নতুন নতুন পথ। এখন তাঁদের কেউ রিকশাচালক, কেউ হয়েছেন সবজি বিক্রেতা, কেউ গলি গলি ঘুরে মাছ বিক্রি করছেন, আবার কেউ ফলমূল। অনেকে মৌসুমি ব্যবসা অর্থাৎ মাস্ক, গ্লাভসও বিক্রি করছেন।
দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এরপর দফায় দফায় বাড়তে থাকে সাধারণ ছুটির মেয়াদ। করোনার সামাজিক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, এখনো বলতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় ঘরবন্দী হয়ে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন পেশার নিম্ন আয়ের মানুষ।
গত এক সপ্তাহে অন্তত ১৫ জন পেশা পরিবর্তনকারীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। আগে তাঁরা কেউ পোশাকশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক ছিলেন। কেউ ওযার্কশপে, কেউ বিপণিবিতানের বিভিন্ন দোকান, শোরুম, জুতা-কাপড়ের দোকানে চাকরি করতেন। কিন্তু এখন এসব বন্ধ থাকায় তাঁদের আয়-উপার্জনও নেই। কিন্তু কারও পরিবারে রয়েছে অসুস্থ সদস্য, আছে আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ। তাঁদের কেউ কেউ সরকারি সহায়তা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাই করোনার কারণে চাকরি না থাকায় বিকল্প পেশা শুরু করতে হয়েছে তাঁদের। এখান থেকে যা আয় করছেন, তা দিয়ে কোনোরকমে চলে যাচ্ছে।
নগরের তামাকুমুণ্ডী লেনে কাপড়ের দোকানে চাকরি করতেন সৈয়দ আহমদ। করোনার কারণে দোকান বন্ধ। আগের মাসে বেতন যা পেয়েছেন, তা–ও শেষের পথে। ঘরে আছে মা, স্ত্রী ও এক সন্তান। তাঁদের নিয়ে আগামী দিনগুলো কীভাবে পার করবেন, তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। পরে এক বন্ধুর পরামর্শে ভ্যান জোগাড় করে ফল বিক্রিতে নেমে পড়েন। এখন বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও গলিতে গিয়ে ফল বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা কেউ জানে না। এত দিন পর্যন্ত তো ঘরে বসে থাকা যাবে না। তাই ফল বিক্রি করছেন।
একসময়ের ওয়ার্কশপের কর্মী এখন রিকশাচালক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, বড় দুই ভাই বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছেন। অসুস্থ মা তাঁর সঙ্গে থাকেন। মায়ের চিকিৎসা, ওষুধের জন্য টাকা দরকার। ঘরে বসে থাকলে তো কেউ দেবেন না। এখন রিকশা চালিয়ে যা পান, তা দিয়ে মা-ছেলের কোনোরকমে চলে যাচ্ছে।
গতকাল বুধবার চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় ভ্যানে করে মাছ বিক্রি করতে আসেন দুই যুবক। তাঁদের থেকে মাছ কেনেন চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আলমগীর মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘বিল্ডিংয়ের নিচে মাছওয়ালা এলে নামি। তাঁদের কাছ থেকে দুটি রুই নিই। কিন্তু ঝামেলা বাধল এক জায়গায়। তাঁরা কাটতে জানেন না। কথা বলে জানলাম তাঁরা পেশাদার মাছ বিক্রেতা নন। দোকানে কাজ করতেন, এখন বন্ধ। তাই বাধ্য হয়ে এই পথে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, আন্দরকিল্লা মোড়ে যে হকার অনেক বছর ধরে পত্রিকা ও বিভিন্ন সাময়িকী বিক্রি করতেন, তাঁর টেবিলে এখন সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মাস্ক ও স্প্রে করার খালি বোতল।
নগরের স্টেশন রোডের যেসব ফেরিওয়ালা আগে পুরোনো মুঠোফোন ও এর বিভিন্ন সামগ্রী (হেডফোন, কেসিং, কভার) বিক্রি করতেন, তাঁদের টেবিলেও এখন শোভা পাচ্ছে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ করোনাভাইরাস রোধে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য।
তবে নতুন পেশায় যোগ হওয়া মানুষের বেশির ভাগই সবজি, ফলমূল, ভোগ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছেন। এ ছাড়া করোনার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আগের চেয়ে কুলি-মজুরের সংখ্যা বেড়েছে ভোগ্যপণ্যের বাজার চাক্তাই, খাতুনগঞ্জেও।
দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হক। দিনে ৫০০ টাকা করে প্রতি মাসে তাঁর আয় ১৫ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে তাঁর বৃদ্ধ মা–বাবা, দুই বোনসহ পাঁচজনের সংসার চলে। করোনা সংক্রমণ রোধে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পরপরই তাঁর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় এক মাসেও সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার লক্ষণ না দেখে সংসার চালাতে রিকশা নিয়ে নেমে পড়েছেন রাস্তায়। ভাড়া ও রাস্তা তাঁর চেনা নেই। জানতে চাইলে বলেন, ‘এত দিন রাজমিস্ত্রির কাজ করেছি। কিন্তু এক মাস ধরে কোনো কাজকাম নেই। গ্রামে মা-বাবা খুব কষ্টে আছে। তাই উপায় না দেখে শেরশাহ এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে রিকশা ভাড়া নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছি।’
নগরীর কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়াম এলাকায় একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন আবু তৈয়ব। স্কুলপড়ুয়া ভাই-বোন ও মা-বাবাকে নিয়ে থাকেন নগরের সৈয়দ শাহ রোডে। করোনার সাধারণ ছুটির আরও ১০ দিন আগে অর্থাৎ ১৫ মার্চ থেকেই রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মার্চ মাসের বেতনও পাননি। বাসাভাড়া ও পরিবারের খরচ চালাতে গেল দেড় মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা ঋণ করেছেন বিভিন্নজনের কাছ থেকে। এখন কারও কাছ থেকে ধারও মিলছে না। তাই নগরীতে এখন ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করছেন।
নগরের প্রবর্তক এলাকায় সবজি বিক্রির সময় বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে বসে আছি। কখন আবার রেস্টুরেন্ট খুলবে জানি না। তাই পেটের তাগিদে ৬০ টাকায় একটি ভ্যান ভাড়া করে পথে নেমেছি। মা-বাবা ও ভাই-বোনের মুখে খাবার তো দিতে হবে।’