'কত দিন পর বাড়ি ফিরতে পারছি, খুব খুশি লাগছে'

ঢাকা থেকে ট্রাকে করে রংপুরে ফিরছিলেন শাহ আলম। করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকায় বগুড়ার মহাস্থান এলাকায় ট্রাক থেকে ফেলে রেখে যাওয়া হয় এই ট্রাকশ্রমিককে। পরে তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৬ দিন চিকিৎসার পর ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় তাঁকে। গতকাল বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে।  সোয়েল রানা
ঢাকা থেকে ট্রাকে করে রংপুরে ফিরছিলেন শাহ আলম। করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকায় বগুড়ার মহাস্থান এলাকায় ট্রাক থেকে ফেলে রেখে যাওয়া হয় এই ট্রাকশ্রমিককে। পরে তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৬ দিন চিকিৎসার পর ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় তাঁকে। গতকাল বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে। সোয়েল রানা

‘এখানকার ডাক্তার–নার্সরা সব সময় সাহস দিয়েছেন। বলেছেন, আমার কিছুই হয়নি, খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারব। রাতে যখন জানলাম সকালে ছুটি দেওয়া হবে, তখন খুব ভালো লেগেছে। কত দিন পর আজ বাড়ি ফিরতে পারছি, খুব খুশি লাগছে!’

গতকাল শুক্রবার কথাগুলো বলছিলেন করোনা জয় করে বাড়ি ফেরা রংপুরের সেই ব্যক্তি। করোনা–আতঙ্কে তাঁকে গত ২৯ মার্চ রাতে ট্রাক থেকে বগুড়ার মহাস্থানগড় বাসস্ট্যান্ডে ফেলে যান সহযাত্রীরা। সুস্থ হওয়ার পর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ওই ব্যক্তিকে গতকাল বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

কী ঘটেছিল ২৯ মার্চ রাতে? জানতে চাইলে শাহ আলম (৫০) নামের ওই ব্যক্তি জানালেন, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ভিক্ষা করতেন। রাতে থাকতেন সবজির আড়তে। করোনার সংক্রমণ শুরু হলে ২৯ মার্চ রাতে তিনি ট্রাকে চড়ে কারওয়ান বাজার থেকে রংপুরের উদ্দেশে রওনা দেন। ট্রাকে আরও ২০ থেকে ২৫ জন ছিলেন। পথে জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্টে তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। শ্বাসকষ্টের জন্য তিনি ইনহেলার ব্যবহার করতেন। কিন্তু তখন সঙ্গে তা ছিল না। চলন্ত ট্রাক থেকে মহাসড়কের পাশে চোখ রাখছিলেন, কোনো ওষুধের দোকান চোখে পড়ে কি না। শ্বাসকষ্টে তিনি যখন ছটফট করছিলেন, তখন করোনাভাইরাস আতঙ্কে ট্রাকের অন্য যাত্রীরা ভোররাতে তাঁকে মহাস্থান বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দেন। দীর্ঘক্ষণ পড়ে থাকার পর পুলিশের সহযোগিতায় রিকশা ভ্যানে তাঁকে প্রথমে শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে তাঁর ঠাঁই হয় বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে।

এরপর কী হয়েছিল? জানতে চাইলে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শফিক আমিন প্রথম আলোকে বলেন, শাহ আলম নামের ওই রোগীকে মার্চ হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ৪ এপ্রিল আইইডিসিআর থেকে তাঁর করোনা পজিটিভ নিশ্চিত করা হয়। টানা দুই সপ্তাহ আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি সপ্তাহে এক দিন নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ল‍্যাবে তিন দফা পজিটিভ শনাক্ত হয়। ১৫ এপ্রিল একই ল‍্যাবে পরীক্ষায় ফল নেগেটিভ আসে। এরপর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এবং বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের ল‍্যাবে আরও দুই দফা ফলাফল নেগেটিভ হওয়ার পর তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি এখন পুরো সুস্থ।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে শাহ আলমকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এ সময় করোনা জয় করে সুস্থ হওয়া হাসপাতালের প্রথম এই রোগীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এ টি এম নুরুজ্জামান, আরএমও শফিক আমিন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাড়া করে দেওয়া অ্যাম্বুলেন্সে তিনি রংপুরের পথে রওনা দেন।

মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালে ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা তাঁর স্ত্রী, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধানসহ ১৬ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বগুড়া পর্যন্ত বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সচালকের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তবে তাঁদের কারও শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি মেলেনি।

এদিকে শাহ আলম সুস্থ হওয়ার পর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের চিকিৎসকদের। আরএমও বলেন, ‘আইসোলেশনে এই মুহূর্তে বেশ কয়েকজন করোনা রোগী থাকলেও এই রোগীর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা আমাদের বড় সাফল্য। কারণ, তিনি হাসাতালের প্রথম করোনা রোগী ছিলেন। তাঁর সুস্থতায় চিকিৎসকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।’