বিদ্রূপ করা মানুষেরাও এখন 'করোনা আপা' বলে কাছে ডাকেন

৮ মার্চ নারী দিবসে দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হলো। খবরটি শুনে নারী হিসেবে কিছু করার তাগিদ অনুভব করলেন বাবলি আকন্দ। একদল স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে এলাকায় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, লকডাউন মেনে চলার বার্তা দিতে লাগলেন তিনি। শুরুর দিক বিষয়টি ভালোভাবে নিতে না পেরে এলাকার অনেকেই বিদ্রূপ করতেন। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর এখন সবাই তাঁকে ভালোবেসে ‘করোনা আপা’ বলে ডাকেন।
বাবলি আকন্দের বাড়ি ময়মনসিংহ নগরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে। তিনি একটি স্থানীয় পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সঙ্গে ২০ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। সবাই নিয়মিত না। তবে বাবলি প্রতিদিনই কাজ করে যাচ্ছেন। শুরুতে ‘করোনা আপা’ ডাক শুনে অস্বস্তি লাগত, এখন আনন্দ লাগে।
এলাকার হতদরিদ্র মানুষেরা খুব অল্পতেই আপন করে নিয়েছেন এই ‘করোনা আপাকে’। ঘরে চাল নেই, খাবার নেই; তবুও তাদের দুশ্চিন্তা নেই। বাবলিকে ফোন দিলেই সমস্যার সমাধান হবে। বাবলিও অসহায় মানুষদের ফোন পেয়ে জেলা প্রশাসক, ওয়ার্ড কাউন্সিলর কিংবা সমাজের বিত্তবানদের জানিয়ে খাদ্য ও ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা করে দেন।
বাবলি বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতে নিজ এলাকার মানুষকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। কেউ রাজি হলেন, আবার কেউ ভয় দেখালেন। যাঁরা আগ্রহী ছিলেন, তাঁদের নিয়ে করোনা প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন করতে নেমে পড়লেন শহরের ভাটিকাশর, বলাশপুরসহ আশপাশের এলাকার রাস্তা, অলিগলি ও বাজারে।
বাবলি বললেন, শুরুতে পরিবারের সমর্থন ছিল না। বাসায় ৩ বছরের সন্তান ও বয়স্ক মাকে রেখে নিজেই না আবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যান—এই ভয়ে পরিবারের সদস্যরা রাজি ছিলেন না। পরে আইন পেশায় নিয়োজিত তাঁর স্বামী তাঁকে সমর্থন দেন এবং পরিবারের সবাইকে বোঝাতে সমর্থ হন। এর মধ্যে তিনি জানতে পারেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওয়ার্ডভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক বাছাই করা হচ্ছে। ফরম পূরণ করে বাবলি এখন জেলা প্রশাসন অনুমোদিত ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবী।
প্রথম দিকে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বাবলি আকন্দ বলেন, মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে এলাকাবাসীর দুয়ো শুনতে হতো। উঠতি বয়সী ছেলেরা আড়াল থেকে তাঁকে ‘করোনা ভাইরাস’ বলে বিদ্রূপ করতেন। এলাকার মুরব্বিরাও ব্যাপারটা ভালোভাবে নেননি। এর মাঝে অন্য একটি সংগঠনের একজন স্বেচ্ছাসেবী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে নানা চাপ আসতে থাকে। এরপরও বাবলি এলাকায় দোকানপাট বন্ধ রাখা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার আহ্বান জানাতেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত কয়েকটি দোকানকে জরিমানা করলে সেই দোকানদারেরা বাবলিকে দায়ী করে নালিশও জানিয়েছেন।
তবে দিন দিন করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় মানুষের ধারণা পাল্টাতে শুরু করে। যারা দুয়ো দিতেন উল্টো তাঁরাই এখন উৎসাহ দেন এবং কোনো সমস্যায় পড়লে বাবলিকে জানান। জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের মেয়র কর্তৃক বরাদ্দকৃত ত্রাণ ও খাদ্যসহায়তা কাউন্সিলরের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে হতদরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি করোনা প্রতিরোধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
নিজের নিরাপত্তার জন্য কোনো পিপিই জোগাড় করতে পারেননি বাবলি। তাই হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক আর মাথায় মপ ক্যাপ পরে প্রতিদিন কাজ শুরু করেন। হ্যান্ডমাইকে, নইলে খালি গলায় মানুষকে সচেতন করেন। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানান।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর কমিটির সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, জাতির এমন ক্রান্তিলগ্নেও নিজের কথা ও পরিবারের কথা বিবেচনা না করে বাবলি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এতে করে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে এবং করোনা প্রতিরোধেই বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে।
জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন, করোনা প্রতিরোধে জেলা প্রশাসন একটি স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করে। বাবলি সেই দলের একজন স্বেচ্ছাসেবক। তিনি মানুষের সেবায় নিজেকে উজাড় করে কাজ করে যাচ্ছেন। এটি অনেকের জন্যই অনুসরণীয়।