>করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশবিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন তাঁদের এ সময়ের আনন্দ–বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

মার্চের শুরুতে টেক্সাসে বসন্ত এল। শীতের শেষে গাছপালা কী সুন্দর রঙিন। চেরি গাছগুলো গোলাপি ফুলে আবহাওয়ায় নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। শিশুরা খেলতে মাঠে আবার বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। তখনই এল বিনা মেঘে করোনাভাইরাসের বজ্রপাত।
টেক্সাসের স্কুলগুলোতে বসন্তকালীন ছুটি শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমার বাচ্চারা ছুটিতে বাসায়। বাইরে খুব ঠান্ডা নেই বলে ভাবছিলাম কোনো পার্কে বেড়াতে যাব। তা আর হলো না। টিভিতে শুনলাম, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের গভর্নররা সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন। প্রথমে শুনলাম, সিয়াটলে করোনাভাইরাসের কিছু রোগী পাওয়া গেছে। তারপরেই শুনি নিউইয়র্কে।
তখনো প্রতিদিন অফিসে যাচ্ছি। এমন একটা প্রশিক্ষণ চলছিল, যেটা কিছুতেই বাসা থেকে করার উপায় নেই। সারা দিন অসম্ভব ব্যস্ত থাকি প্রশিক্ষণে। অফিস ডাউন টাউনে। তাই ট্রেনে যাতায়াত করতে হয়। দিন শেষে ট্রেনে ফেরার সময় মোবাইল স্ক্রল করি। একটিও ভালো খবর নেই। ট্রেন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। একদিন নেমেই দোকানে দৌড়ে যাই হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে। কোনো দোকানে কিচ্ছু নেই। আতঙ্কিত মানুষ হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জীবাণুনাশক আর ওষুধপথ্য কিনে দোকান খালি করে ফেলেছে।
ভোরে ভয়ে ভয়ে অফিসে যাই। এদিকে বাচ্চারা বাসায়। ওদের বাবা বাসায় থেকে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় তবু রক্ষা। নইলে বিদেশে এক দিনও চাইল্ড কেয়ার ছাড়া বাচ্চা রেখে কাজে যাওয়া খুব কঠিন। অবশেষে চার–পাঁচ দিনের মধ্যেই ডাউন টাউনে করোনার রোগী ব্যাপকভাবে বেড়ে গেল। প্রশাসন থেকে নির্দেশ এল জরুরি সেবা ছাড়া বাকি সব বন্ধ। প্রতিদিন ট্রেনে করে অফিসে যাওয়ার আতঙ্ক থেকে বাঁচলাম।
যুক্তরাষ্ট্রে কাঁচাবাজারের দোকান সব সময় নিত্যপণ্যে সয়লাব। কী নেই সেখানে! কিন্তু করোনা–সংকটের সময়ে কোথাও কিছুই নেই। অবিশ্বাস্য কাণ্ড! বিরাট তালিকা দিয়ে আমার স্বামীকে পাঠিয়েছিলাম। প্রায় শূন্য হাতে ফিরে এল। করোনার ভয়ে সবাই মজুত করেছে। টিভি সংবাদে দেখলাম, এক ভদ্রমহিলা ৫০ প্যাকেট নুডলস কিনতে গিয়েছিলেন, দোকানের ম্যানেজার বাধা দেওয়ায় ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। মজুতদারির জন্য শুধু বাঙালিকে দোষ দেওয়ার কোনো মানে নেই। ধনী আর গরিব দেশের মানুষ এখানে এক।
এখন আর দোকানে গিয়ে বাজার করি না। সব অনলাইনে। অফিসের কাজ শেষে সন্ধ্যায় অনলাইনে কাঁচাবাজারের অর্ডার করতে করতেই দু–তিন ঘণ্টা চলে যায়। অর্ডার করতে গিয়ে প্রায়ই দেখি, কোথাও দুধ পাওয়া যাচ্ছে না। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। অর্ডার করলে পেতে পেতে পাঁচ–ছয় দিন লেগে যায়। অনলাইনে অসংখ্য ভুঁইফোড় বিক্রেতা। চড়া দামে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, গ্লাভস বিক্রি করতে তাদের ভিড় লেগে গেল।
বাচ্চারা এখন অনলাইনে অনুশীলন নিতে শুরু করেছে। এ বছর হয়তো ওদের স্কুলে যাওয়া হবে না। আমরা তো অনেক সৌভাগ্যবান। বাড়ি থেকেই অফিস করতে পারছি। কিন্তু অসংখ্য মানুষের তো সেই সুযোগ নেই। ছোট মাঝারি বড়—নানা ধরনের ব্যবসাই বন্ধ। অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই কাজ হারিয়েছেন প্রায় ৬ লাখ লোক। সংখ্যাটি সেখানেই থেমে নেই। দিন দিন বাড়ছে।
এই বন্দিজীবনকে নানাভাবে সহনীয় করার চেষ্টা করছি। কোনো দিন মাস্ক পরে বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটাহাঁটি করি বাড়ির পাশের ন্যাচারাল ট্রেইলে। প্রকৃতি অসম্ভব সবুজ। নানা রকমের পাখি। মাঝেমধ্যে ছুটে আসে কাঠবিড়ালি। মানুষের সমাগম নেই বলে শহরের পথেও হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায় পশুপাখির পদচারণ।
আমি কখনো অনেক দিনের ব্যস্ততায় না–পড়া কোনো বই নিয়ে বসি। ই–বুক নয়, কাগজের সত্যিকারের বই। সেই ছাত্রজীবন ফিরে আসে।
বাংলা নববর্ষ এবার চলে গেল অনাড়ম্বরে। এই ভাইরাস কত নতুন ভাবনা এনে দিচ্ছে আমাদের। সত্যিই এখন অগ্নিস্নানে ধরার শুচি হওয়ার সময়। আমরা নিয়মিত হাত ধুচ্ছি, শরীর পরিচ্ছন্ন রাখতে। এখন সময় এসেছে আমাদের মন আর আত্মার শুচিতা, শুদ্ধতা আর পরিশোধনের।