যথাসময়ে উদ্যোগ নিতে হবে, চুরিও ঠেকাতে হবে

ড. এ এম এম শওকত আলী
ড. এ এম এম শওকত আলী

কৃষি খাতে করোনার প্রভাব নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে। এর বেশির ভাগই কৃষির ক্ষয়ক্ষতিকেন্দ্রিক। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও করোনার সময়ে কৃষি খাতে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। সেই দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ব্র্যাক থেকে গবেষণা করে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমি মনে করি, এই হিসাব এখনো অসম্পূর্ণ। কারণ, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণেও ক্ষতি হয়েছে। সামনে বন্যা আসছে, সেখানেও ক্ষতি হবে। এরপর আসছে আমন মৌসুম। কৃষকের হাতে চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা নেই। সেগুলো হিসাবে আনলে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে।

সরকার কৃষকদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু ব্র্যাকসহ বেসরকারি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সুবিধাভোগীদের ক্ষতিপূরণে কী উদ্যোগ নিল, এখনো আমরা তা জানতে পারিনি। সেটা জানাটা খুব জরুরি। কারণ, সরকার একা এই পরিস্থিতি সামলাতে পারবে না। উন্নয়ন সংস্থা ও বেসরকারি খাতকে পাশে রেখে তা করতে হবে।

১৯৯৮ সালের বন্যার পর আমরা সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়েছিলাম। সে সময় একটি বিদেশি গণমাধ্যমে সংবাদ এসেছিল, বাংলাদেশে বন্যায় খাদ্যাভাবে ১০ লাখ লোক মারা যাবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক সভায় আমার কাছে একজন জানতে চেয়ে বলেছিল, ‘কত লোক মারা যেতে পারে?’ আমি উত্তরে বলেছিলাম, ‘একজনও না খেয়ে মরবে না।’ আমরা ওই বছর খাদ্য আমদানিতে বেসরকারি খাতকে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিলাম। তখন খাদ্য আমদানিতে কোনো শুল্ক ছিল না। খাদ্য বণ্টন ও বিপণনব্যবস্থাতে সে বছর কোনো সংকট হতে দিইনি। বেশির ভাগ কৃষি উপকরণ বাজারে সহজলভ্য থাকাটা নিশ্চিত করেছিলাম। ফলে বাম্পার ফলন হয়েছিল।

২০০৭-০৮ সালেও আমরা একই ধরনের পরিস্থিতি সামলেছি। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর বন্যা হলো। ফসলের অনেক বড় ক্ষতি হলো। সংকট দেখা দিল। ভারত থেকে চাল আমদানি করা যাচ্ছিল না, তৎকালীন সময়ে কংগ্রেস সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রণব মুখার্জির হস্তক্ষেপে পাঁচ লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি করেছিলাম। আবার দেশে চালের দামও দ্রুত বাড়ছিল। বিকল্প হিসেবে আমরা ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে চাল আমদানির ব্যবস্থা করেছিলাম। এ বছর সংকট হলে ভারত থেকে একই ধরনের সহায়তা না-ও পাওয়া যেতে পারে। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

করোনার কারণে কৃষিতে যে ক্ষতি হয়ে গেল, সবার আগে সরকারকে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কোনো কারণে খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা পূরণ করা সম্ভব হয় না। তাই সংকটের বিষয়টি আন্দাজ করে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হয়। আমার মনে হচ্ছে, সরকারকে সামনে চাল আমদানি করতে হতে পারে। এ জন্য এখনই ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে। কারণ, ভারতে করোনার কারণে ক্ষতির পাশাপাশি পরপর দুটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত করল। এখন পঙ্গপালের কারণেও সেখানে ফসলের ক্ষতি হয়ে গেছে। এই দেশ থেকে আমরা কতটুকু চাল আমদানি করতে পারব, তা অনিশ্চিত। এখনই যদি চাল দরকার না-ও হয়, তারপরও বিশ্ববাজার থেকে অগ্রিম চাল কিনে রাখা উচিত, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত দেশে সেই চাল নিয়ে আসা যায়। ভারতে পঙ্গপাল হানা দেওয়ার পর বাংলাদেশেও এই ধরনের কীটপতঙ্গ বড় ধরনের সমস্যা করতে পারে। ফলে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উচিত এ ব্যাপারে কঠোর নজরদারি রাখা। কৃষি উপকরণের বিশ্ববাজার এখন বাংলাদেশের জন্য অনুকূল। সব ধরনের সারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত কমছে। আবার হঠাৎ তা বেড়েও যেতে পারে। ফলে দাম কম থাকা অবস্থাতেই প্রয়োজন অনুযায়ী সার কিনে রাখা উচিত।

সরকার থেকে কৃষকদের ৫ শতাংশ হার সুদে ঋণ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কৃষকেরা এমনিতেই দুই বছর ধরে ফসলের দাম পাচ্ছেন না। বেশির ভাগ কৃষক ঋণগ্রস্ত অবস্থায় আছেন। এখন এই ঋণের বোঝার সঙ্গে নতুন ঋণ যোগ হবে। ফলে এই সব ঋণ তাঁরা কতটুকু পরিশোধ করতে পারবেন, তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। ফলে কৃষকদের সহায়তার বিষয়টি আরও সৃজনশীল ও গবেষণালব্ধ হওয়া উচিত। সরকারের তরফ থেকে ওই ঋণের পুনঃ তফসিলের বিষয়টি দ্রুত ঘোষণা করা জরুরি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সবার নজর কম মনে হচ্ছে। সেটা হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে উপকূলের অনেক এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। সেগুলো এখনো মেরামত করা হয়নি। এর আগে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পরেও একই ধরনের অবস্থা আমরা দেখেছিলাম। বাঁধ মেরামতে দেরি হলে তার ফাটল আরও বড় হয়। জোয়ারের পানি কৃষিজমিতে আসে, ফলে ফসল চাষ করা যায় না। পানি উন্নয়ন বোর্ড যেভাবে বাঁধ মেরামতের কাজ করে, অর্থাৎ দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শুরু করে। কিন্তু আমি সাতক্ষীরায় স্থানীয় মানুষ নিজেদের উদ্যোগে বাঁধ মেরামত করছে শুনেছি। যাঁরা এগুলো করছেন, সরকারের উচিত তাঁদের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের কর্মসৃজন কর্মসূচির আওতায় সহায়তা দিয়ে বাঁধ মেরামতের কাজ এগিয়ে নেওয়া। পরে ভালোমতো মেরামত করা যাবে। কিন্তু এখনই বাঁধের ভাঙা অংশ জোড়া না দিলে উপকূলীয় এলাকার প্রধান ফসল আমন চাষ তাঁরা করতে পারবেন না।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে কৃষকদের সহায়তা হিসেবে বিনা মূল্যে বীজ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অন্যান্য কৃষি উপকরণ তাঁরা যাতে সহজে ও সুলভ মূল্যে পান, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বলা হচ্ছে, এই বছরের শেষের দিকে করোনার আরেকটি বড় ঢেউ আসতে পারে। বাংলাদেশে এর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সে সম্পর্কে সরকারকে ধারণা নিতে হবে। সামনের দিনের পরিস্থিতি ঠিকমতো ধারণা করতে না পারলে শুধু কৃষি কেন, অন্য কোনো ধরনের পরিকল্পনা করা ও এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

আরেকটি বিষয় খুবই দুঃখজনক। করোনার সময়ে গরিব মানুষের জন্য ১০ টাকার চাল দেওয়া হচ্ছে। সেটি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই চুরি করছেন। এই অপরাধে তাঁদের অনেককে সরকার থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও চুরি থেমে নেই। সরকার যদি চুরি থামাতে কঠোর না হয়, তাহলে কৃষি পুনর্বাসনের যে সহায়তা দেওয়া হবে, তা-ও কৃষকের হাতে পৌঁছাবে না। ফলে গরিবের চাল যাঁরা চুরি করছেন, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক ও রাজনৈতিকভাবে শাস্তি দেওয়া উচিত।

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা