বঙ্গবন্ধুর অন্য রকম মুহূর্ত

‘তোমার আব্বাকে আব্বা বলি?’
১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে জেলবন্দী বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেলেন। দেখলেন, বাবা এসেছেন তাঁকে নিতে। নানা পথ পেরিয়ে ৫ দিন পর বাড়ি পৌঁছালে বঙ্গবন্ধুর গলা জড়িয়ে তাঁর বড় মেয়ে শেখ হাসিনা বললেন, ‘আব্বা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। রাজবন্দীদের মুক্তি চাই।’ ছোট্ট শেখ কামাল কাছে এল না। তাকিয়ে থাকল তাঁর দিকে।

বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিব বিছানায় বসে গল্প করছিলেন। হাসিনা ও কামাল খেলছিলেন নিচে। হাসিনা মাঝেমধ্যে খেলা ফেলে এসে ‘আব্বা আব্বা’ বলে ডাকছিলেন।

একসময় কামাল হাসিনাকে বলল, ‘হাসু আপু, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি?’

‘আমি তো তোমার আব্বা!’ সস্নেহে ওকে বললেন বঙ্গবন্ধু।

বৈষম্যের ছবি

১৯৭০ সালে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয় যথাক্রমে ৭ ডিসেম্বর ও ১৭ ডিসেম্বর। এর আগেই ১২ নভেম্বর উপকূলবর্তী এলাকায় আসে প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস। প্রাণহানি ঘটে লাখ লাখ মানুষের। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া চীন থেকে ফেরার পথে ঢাকায় এসে বিমানে করে বিধ্বস্ত এলাকা ঘুরে চলে যান। কোনো উদ্যোগ আর নেননি।

বঙ্গবন্ধু তখন খুলনায় নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত। ঘূর্ণিঝড়ের খবরে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড বন্ধ করে ১৮ নভেম্বর চলে যান ভোলায়।

২৬ নভেম্বর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিপর্যয়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার ও ত্রাণের কাজ শুরু হলে মানুষ এভাবে মারা যেত না। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এটা ভাগ্যের পরিহাস যে পশ্চিম পাকিস্তানে যখন খুব ভালো শস্য ফলেছে, তখন আমাদের কাছে প্রথম খাদ্যশস্যের চালান এসেছে বিদেশ থেকে। যখন পশ্চিম পাকিস্তানে আমাদের বিপুলসংখ্যক সৈন্য মোতায়েন রয়েছে, তখন পটুয়াখালীতে ঘূর্ণিঝড়ে নিহতদের লাশ কবর দিতে হচ্ছে ব্রিটিশ মেরিনদের।’

বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের বস্ত্রকলগুলো বাংলাদেশকে প্রধান বাজার হিসেবে ব্যবহার করলেও নিহতদের জন্য তারা এক গজ কাফনের কাপড়ও পাঠায়নি।’

আরেকটা বাংলাদেশ

গণভবনের দেয়ালে টাঙানো বাংলাদেশের মানচি‌ত্র। মাঝেমধ্যে বঙ্গবন্ধু সেদিকে তাকিয়ে কিছু ভাবেন। একদিন এক কর্মকর্তাকে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘বাংলাদেশ খুব ছোট, তাই না? চলো, একবার উপকূলের চরগুলো দেখে আসি।’

হেলিকপ্টারে উঠে বঙ্গবন্ধু পাইলটকে বললেন, ‘উপকূলে যেখানে ছোট ছোট চর পড়েছে, সেগুলো দেখতে চাই।’

প্রথমে চর কুকরিমুকরি। পরে সদ্য জেগে ওঠা নিঝুম দ্বীপে হেলিকপ্টার নামল। বঙ্গবন্ধু তাকিয়ে থাকলেন, বাড়িঘর নেই। মাঝেমধ্যে কাশবনের মতো কিছু ঝোপঝাড় আর জেলেদের দু–একটা কুঁড়েঘর।

ফিরে এসে পাইলটকে বললেন চরের প্রান্ত থেকে চারপাশে যত দূর সমুদ্রের তলদেশ দেখা যায়, তত দূর হেলিকপ্টার ঘুরিয়ে আনতে।

দেখতে দেখতে পাশে বসা কর্মকর্তাকে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমাদের দেশটা এখন ছোট। কিন্তু এই বিশাল এলাকায় বাঁধ দিয়ে দিয়ে যদি জমিগুলো উদ্ধার করতে পারি, তাহলে তো আরেকটা বাংলাদেশ জেগে উঠবে।’

যার জমি তার ফল

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘোড়দৌড় বন্ধ করে দেওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ডেকে বললেন, ‘রেসিং ট্র্যাকের ওপর সারি বেঁধে নারকেলগাছ লাগাও।’

একজন কর্মকর্তা হা হা করে উঠলেন, ‘ফলের গাছ লাগালে লোকজন তো সেই ফল চুরি করে খেয়ে নেবে।’

বঙ্গবন্ধু হেসে বললেন, ‘জনগণের জমি, জনগণের গাছ। ওরাই যদি ফল খায়, আপনার-আমার আপত্তি কোথায়?’ গ্রন্থনা: জাহীদ রেজা নূর

অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, ইউপিএল, ২০১২; কারাগারের রোজনামচা, শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলা একাডেমি, ২০১৭; ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যূদয়, মোশাররফ হোসেন, দ্যু প্রকাশন; ‘কালের সীমা ছাড়িয়ে’, মনোয়ারুল ইসলাম, প্রথম আলো, ১৭ মার্চ ২০১৮