করোনাকেন্দ্রিক বাজেট দরকার

ফজলুল হক
ফজলুল হক

সামগ্রিকভাবে আগামী অর্থবছরের বাজেট করোনাকেন্দ্রিক হওয়া দরকার। ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়া মহামারি ভাইরাসটি বর্তমানে বড় একটি সমস্যা। এটি থেকে উত্তরণে যেন লম্বা সময় না লাগে, সে জন্য বাজেটে কার্যকর পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনা থাকতে হবে।

করোনা সংকট মোকাবিলায় ইতিমধ্যে সরকার বেশ কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে সেগুলো পুনর্গঠন করা দরকার। প্যাকেজগুলো ব্যাংকঋণনির্ভর। বলা হচ্ছে, ব্যাংক ও গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হবে। ব্যাংক তো সব সময় এভাবেই গ্রাহকদের ঋণ দিয়ে থাকে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকাররা ঋণ দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না। তাঁরা মনে করছেন, ঋণ দিলে তা ফেরত পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে সরকার ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ করবে। তাতে ব্যাংকের তারল্যসংকট হবে। শেষ পর্যন্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছাড়া অন্য কেউই ঋণ পাবেন না। বিষয়টি সুরাহার একটি প্রতিফলন বাজেটে থাকা দরকার বলে মনে হয়।

আমাদের অর্থনীতির জন্য রপ্তানি খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে খাতটি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নেই। খুব আশাবাদী হলেও বলতে হবে, পরিস্থিতি উন্নতিতে কমপক্ষে ছয় মাস লাগবে। তত দিন কারখানাগুলোকে টিকে থাকতে হবে। সব স্বাভাবিক হলে ক্রেতারা আবার ক্রয়াদেশ দেবেন। তবে বন্ধ কারখানা তো আর ক্রয়াদেশ পাবে না। তা ছাড়া রপ্তানিমুখী শিল্প টিকে না থাকলে নানামুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যেমন অনেক মানুষ চাকরি হারাবেন, সহযোগী স্থানীয় শিল্পকারখানা বন্ধ হবে, অভ্যন্তরীণভাবে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা কমে যাবে ইত্যাদি। তাই রপ্তানি খাতকে টিকিয়ে রাখতে বাজেটে সাহসী বরাদ্দ রাখতে হবে। বরাদ্দ থাকা মানেই টাকা বিলিয়ে দেওয়া কিংবা লুটপাট নয়। বাজেটের পর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে তা ক্ষতিগ্রস্তদের দিতে হবে।

সবার সঙ্গে আমারও প্রত্যাশা, আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর হবে। তবে কেবল বরাদ্দ বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। বরাদ্দের পাশাপাশি বাজেটে সুস্পষ্ট বার্তা দিতে হবে বরাদ্দ অর্থ কীভাবে পরিকল্পনামাফিক খরচ করতে হবে। আসলে আমি বলতে চাচ্ছি, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের বিষয়ে গুণগত পরিবর্তন আনা ছাড়া কাজের কাজ কিছু হবে না।

করোনায় অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে। হয়তো আরও হবে। তাই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের মতো কয়েকটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত শেষ করতে বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখতে হবে। আর কম অগ্রাধিকার প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে সেই অর্থ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকরভাবে ব্যয় করা দরকার। মনে রাখতে হবে, খরচের ক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধ করা গেলে কম অর্থেও বেশি কাজ করা সম্ভব। কঠিন হলেও সরকার সেই পথে হাঁটবে বলে আমার প্রত্যাশা।

করোনার কারণে পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে কর্মরত মানুষ চাকরি হারাবেন। কাজ না থাকায় প্রবাসী শ্রমিকেরাও দেশে ফিরবেন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে চাকরি দিতে হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে গতি ফেরাতে নানামুখী উদ্যোগ লাগবে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ (রেমিট্যান্স) কীভাবে উৎপাদনশীল খাতে নিয়ে আসা যায়, সেটিও চিন্তাভাবনা করতে হবে।

ফজলুল হক  : সাবেক সভাপতি, বিকেএমইএ