চা ও নচিকেতায় মুগ্ধতা

গৌরব গুহ ও তাঁর স্ত্রী মিলে চালান নচিকেতা নামের এই দোকান
গৌরব গুহ ও তাঁর স্ত্রী মিলে চালান নচিকেতা নামের এই দোকান

বাংলা গানের জগতে নচিকেতা এক ঝড়ের নাম। গিটার হাতে এক বিদ্রোহীর ছবি, জীবনমুখী গানের জন্য খ্যাতি জগৎজোড়া। ‘সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা’ প্রথম প্রেমিকাকে হারিয়ে ফেলা সব প্রেমিক পুরুষের কণ্ঠস্বরে উচ্চারিত হয় তাঁর গানের কলি।

কলকাতার এই গায়ক তাঁর গান আর জীবনাচরণে সহযাত্রীদের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। সেই নচিকেতা গানের বাইরে এসে একটি চায়ের দোকান ঘিরে আবারও ঝড় তুলেছিলেন। নচিকেতার ভক্ত হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢাকায় বসেই সেই খবর পাই। ঝড় তোলা দোকানটির নাম ‘চা ও নচিকেতা’।

হাতেও এঁকেছেন নচিকেতার উল্কি
হাতেও এঁকেছেন নচিকেতার উল্কি

নচিকেতার ভক্ত হিসেবে কলকাতা ঘুরতে যাওয়ার আগেই পরিকল্পনা পাকা। চা ও নচিকেতা দেখতে যেতেই হবে। সঙ্গে চা খাওয়া। গত ৮ জুলাই রাতে কলকাতা নিউমার্কেট থেকে গান এবং চায়ের স্বাদ নিতে যাত্রা শুরু। গন্তব্য পাটুলি। বিশ্ব বাংলা হাইওয়ে পাশেই যার অবস্থান। বাহন কলকাতার বিখ্যাত হলুদ ট্যাক্সি। সফরসঙ্গী সহধর্মিণী শারমিন, বন্ধু হাবিবুল্লাহ সিদ্দিক, তাঁর স্ত্রী তানিয়া এবং জয়দীপ সুমন। হাইওয়ে ধরে সাঁই সাঁই করে চলছে বাস, ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার। আমাদের ট্যাক্সিও অন্য বাহনের সঙ্গে গতি মিলিয়ে এগিয়ে চলে। মিনিটের কাঁটা এক চক্কর শেষ করার একটু পরেই পৌঁছে যাই আমাদের গন্তব্যে। পুরো জায়গাই সাজানো-গোছানো। লাল-নীল-হলুদ বাতির আলোকোজ্জ্বল। হাইওয়ের পাশে ফুটপাতের পরেই লেক। লেকের দুই ধারে বসার জায়গা। লেকের ওপরে হাওড়া ব্রিজের আদলে রেপ্লিকা ব্রিজ। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য আরও কত-কী। বিশ্বকাপ ফুটবলের মৌসুম হওয়ার কারণে পুরো এলাকাজুড়ে বিশ্বকাপের সাজগোজে বিশ্বকাপের একটা ছোঁয়া রাখা হয়েছে। মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমারদের ছবি টানানো হয়েছে। পুরো এলাকাতেই বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণী, হাঁটতে আসা মানুষ, পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা লোকজন আর অফিস ফেরত মানুষের ভিড়।

চা ও নচিকেতায় যাওয়ার আগেই এর মালিকের সঙ্গে কথা বলে রাস্তা চিনে নিই। দোকানের পাশেই আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায় দোকানটি। দোকানের ভেতর বাজছে গায়কের গানের কলি সঙ্গে সাদা-কালো-রঙিনে মিলিয়ে গায়কের অন্তত ২০টি ছবি।

চা ও নচিকেতার শুরুটা খুব অদ্ভুত। বলা যায়, অনেকটাই রূপকথার গল্প। নেশার জগতের সঙ্গে জড়িয়ে জীবনের প্রদীপ নিভে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল যুবক গৌরব গুহর। নচিকেতার ‘লড়াকু’ গানই জীবনের দিকে পাশ ফিরতে উৎসাহ দেয়। রিহ্যাব-জীবনেও আঁকড়ে ধরেছিলেন তাঁকেই। তিন মাস পুনর্বাসন কেন্দ্রে কাটিয়ে নেশা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন গৌরব। ২০০৯ সালে মাদকাসক্তি থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসেন। চাকরির চেষ্টা করে একটা সময় হাল ছেড়ে দেন গৌরব। তাঁকে কে কাজ দেবে? অতঃপর চায়ের দোকান। সারা দিন নচিকেতার গান শোনা আর চা বিক্রি। এরই মাঝে সদস্য হন তাঁর ফ্যান ক্লাব ‘আগুনপাখি’র। চা দোকান করার ফাঁকে ফাঁকে নচিকেতার কলকাতায় প্রায় সব অনুষ্ঠানে যেতে শুরু করেন। নচিকেতার গানেই স্বস্তি পেতেন গৌরব।

চা ও নচিকেতা
চা ও নচিকেতা

গৌরব প্রথম চায়ের দোকান দেন যাদবপুরে। গৌরবের কথায়, ‘দোকান শুরুর সময় থেকেই দোকানের দেয়ালে গুরুর (নচিকেতা) ছবি টাঙিয়ে রাখতাম। গুরুর গানও বাজাতাম দোকানে।’

কথাটা নচিকেতার কানে পৌঁছতে দেরি হয়নি। একদিন নিজেই হাজির হয়ে যান গৌরবের চায়ের দোকানে। জানতে পারেন, ক্লাস ফোর থেকে গৌরব তাঁর গানের অন্ধ ভক্ত।

বেশি দিন দোকানে সুখে কাটাতে পারেননি গৌরব। রাস্তা বড় করার জন্য যাদবপুরের দোকানটি বন্ধের নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। নচিকেতার উদ্যোগেই সামান্য দূরে নতুন দোকান পান তিনি। ওই দোকানটি ফিতা কেটে উদ্বোধন করেছেন নচিকেতা নিজেই। গৌরব জানান, উদ্বোধনের পুরো দিনটা বিনা পয়সায় চা খাওয়ানো হয়। খরচের পুরো টাকাই দিয়েছিলেন নচিকেতা।

পাটুলির ‘চা ও নচিকেতা’ গৌরবের দ্বিতীয় চায়ের দোকান। এ দোকানটিও নচিকেতার নামে উৎসর্গ করা। গৌরবের কথায়, ‘দোকানেও নচিদাই আমার সঙ্গী। আগে শুধু তাঁর ছবি টাঙিয়ে রাখতাম আর গান বাজাতাম। এবার গোটা দোকানটাই নচিকেতার নামে উৎসর্গ করলাম।’

শুধু গানেই নয়, চা-ও ভালো বানান গৌরব। পাটুলির দোকানে সঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী। দুজন মিলেই এখন চা ও নচিকেতাকে শহরময় ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। জানালেন, ‘সব সময় ভালো চা খাওয়ানো এবং নচিকেতার অমর বাণী শোনানোর ব্যবস্থা করি।’

বেলা তিনটা থেকে শুরু হয় পাটুলির চা ও নচিকেতা। চলে রাত ১২টা পর্যন্ত। গৌরবের মতো ‘সাবেক’ মাদকাসক্ত ব্যক্তিরাই এই দোকানে কাজ করেন। এই দোকানে কাজ করার অন্যতম যোগ্যতাই এটি।