'নিজেরা নিজেদের আর্টিস্ট ভাবি'

নিজের চিত্রকর্মের সামনে কাজী সাঈদ আহমেদ
নিজের চিত্রকর্মের সামনে কাজী সাঈদ আহমেদ

বিস্কুট বানাতে লাকড়ি লাগে। কারখানায় জ্বালানি হিসেবে প্রচুর লাকড়ি দরকার হয়। পুরোনো ঢাকার শ্যামবাজারে ছিল সে রকম এক বিস্কুটের কারখানা। কারিগরেরা লাকড়ি পুড়িয়ে তৈরি করতেন কেক আর বিস্কুট। কারখানা মালিকের ছেলে লাকড়ি দিয়ে আঁকতেন ছবি। সেই কারখানায় আজও বিস্কুট তৈরি হয়। লাকড়ি দিয়ে ছবি আঁকা শিল্পী কাজী সাঈদ আহমেদ অবশ্য মাধ্যম বদলেছেন। এখন তিনি আঁকেন পাট দিয়ে।

২০০০ সাল থেকে পাটের চটের ওপর ছবি আঁকছেন কাজী সাঈদ আহমেদ। বড় ভাই শিল্পী কাজী সালাউদ্দিন আহমেদের পরামর্শে ক্যানভাসের মধ্যে কাপড়ের বদলে চট ব্যবহার শুরু করেন। চারুকলার শিক্ষকেরা সেই কাজ পছন্দ করেন। প্রতিযোগিতায় জমা দিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে পেয়েছেন পুরস্কার। পরে পড়ালেখা করে জানতে পারেন, আলবার্ট গুরিক নামের এক শিল্পী চটের ওপর ছবি আঁকতেন। পেশায় চিকিৎসক ছিলেন তিনি। রোগীর অস্ত্রোপচারের পর রক্ত লেগে থাকা ব্যান্ডেজ কেটেকুটে চটের ওপর সাজিয়ে তৈরি করতে ছবি। সেটা ১৯৫০ সালের কথা। শিল্পী এস এম সুলতানও চটকে ক্যানভাস করে এঁকেছেন। ঢাকায় এখন চট দিয়ে কাজ করা শিল্পী হিসেবে কাজী সাঈদ আহমেদকেই চেনেন সবাই।

ফেলে দেওয়া পাটের চট কীভাবে হয়ে উঠল তাঁর শিল্প সৃজনের উপকরণ, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেই গল্প বললেন কাজী সাঈদ আহমেদ, ‘একসময় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে থেকে ফেলে দেওয়া চট সংগ্রহ করতাম। যে চটগুলো দিয়ে আর হাঁড়িপাতিল বাঁধা যেত না, সেগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হতো। লোক দিয়ে সেগুলো তুলে এনে বাড়িতে ধুয়ে শুকাতাম। কাপড়ের রং গুলিয়ে তাতে লাগিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতাম, বাতিল চটের পুনর্জন্ম দেওয়া আর কি। দেশে যখন পাটের ব্যবহার কমতে শুরু করে তখন ভাবলাম, পাটকে মানুষের শোয়ার ঘরে নেওয়া যায় কি না, দেখি।’

‘পেরেছিলেন?’

‘ঠিক জানি না। তবে বুধবার একটা মেইল পেলাম। ব্রিটিশ এক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী, নাম অ্যালেন ওয়ালে। তিনি আমার অনেকগুলো শিল্পকর্ম কিনেছিলেন। তিনি লিখেছেন, “ঘুম থেকে উঠেই আমি তোমার কাজ দেখি।” ভেবে দেখেছেন বিষয়টা? নিজের হংকং অফিসে তিনি আমার শিল্পকর্ম রেখেছেন, বালিতে একটা বাড়ি বানিয়েছেন, সেখানেও রেখেছেন। ডাস্টবিন থেকে কুড়ানো চট এখন সুইজারল্যান্ডে।’

কাজী সাঈদ আহমেদের একটি চিত্রকর্ম
কাজী সাঈদ আহমেদের একটি চিত্রকর্ম

কাজী সাঈদ আহমেদের ছয় ভাই, পাঁচ বোন। চার ভাই পড়েছেন মোহাম্মদপুর রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ক্র্যাফট, ড্রয়িং, খেলাধুলাসহ অনেক কিছু শেখানো হতো সেখানে। সেটাই ছিল তাঁর অনুপ্রেরণার জায়গা। বাবা এমন মানুষ ছিলেন, কোনো কিছুতেই নিষেধ করতেন না। সে জন্যই দুই ভাই শিল্পী হতে পেরেছেন। ছবি বিক্রির টাকায় ছাত্র থাকাকালীন ঘুরেছেন ১৩টি দেশ। লন্ডন, কলকাতা, বোম্বের মতো শহরগুলোতে প্রদর্শনী করেছেন।

সম্প্রতি খানিকটা হতাশ এই শিল্পী। ১৮তম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী থেকে তাঁর শিল্পকর্ম বাদ পড়েছে। শিল্পকর্মটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেড় মাস ধরে ৬ ফুট বাই ১২ ফুটের কাজটি করেছিলাম, পুরোটাই কাঁচা চটের ওপর। ডাই রং ব্যবহার করেছিলাম তাতে। কাজটা বাদ পড়ল। জুন মাসে একটা সম্মেলনে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম। সেখানে ৩০টি দেশ থেকে প্রায় ৭০ জন শিল্পী এসেছিলেন। দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছিল। বড় মুখ করে বলেছিলাম, আমার ছবিও জমা দিয়েছি। অথচ ছবিটা বাদ পড়ল। আমি ইয়াং আর্টিস্ট এক্সিবিশন, ন্যাশনাল আর্ট এক্সিবিশন, দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী কোনোটিই বাদ দিই না। সব সময়ই নতুন নতুন সব ছবি জমা দিই। এশীয়তে ছবিটি সিলেক্ট হয়নি বলে খুব কষ্ট পেয়েছি।’ আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকার লা গ্যালারিতে গেলে অবশ্য ছবিটি দেখা যাবে। গতকাল শুক্রবার বিকেল থেকে সেখানে শুরু হয়েছে নয়টি ছবি নিয়ে কাজী সাঈদ আহমেদের একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী ‘বাহ্য প্রতীক’।

কাজী সাঈদ আহমেদের একটি চিত্রকর্ম
কাজী সাঈদ আহমেদের একটি চিত্রকর্ম

সম্প্রতি একটি বড় কাজ শেষ করেছেন কাজী সাঈদ আহমেদ। ৬ ফুট বাই ১৮ ফুট ক্যানভাসে এঁকেছেন বাংলাদেশের ইতিহাস। সেখানে থাকবে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ। মিরপুরের ফিন্যান্সিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাকাডেমিতে ঝুলিয়ে দিয়ে এসেছেন। শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হবে সেটি। নিজের উল্লেখযোগ্য ও পছন্দের একটি কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি সাধারণত পোর্ট্রেট করি না। পাট দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৩ ফুট বাই ৪ ফুট আকারের একটা পোর্ট্রেট করেছিলাম। সেটা এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসায় আছে।’

দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে কাজ থাকছে না বলে তিনি একাই কষ্ট পেয়েছেন, তা নয়। এক অগ্রজ শিল্পী তাঁকে বলছিলেন, ‘ভাইবা দেখো, আমরা নিজেরাই নিজেদের আর্টিস্ট মনে করি। আমরা আসলে আর্টিস্ট না।’