টাকার পরিমাণ ও ছবির মানে হতাশা

চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদানের পরিমাণ নিয়ে বেশির ভাগ সময় নির্মাতাদের নাখোশ হতে দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনুদানপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন পরিচালক-প্রযোজক বলেছেন, যে পরিমাণ অর্থ অনুদান হসেবে দেওয়া হয়, তাতে ভালো ছবি বানানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে অনুদানের ছবির মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে ফি বছর। অনুদানের ছবি নিয়ে প্রদর্শকেরাও উদাসীন। বাণিজ্যিক প্রেক্ষাগৃহগুলোয় অনুদানের ছবির কাটতি নেই।
১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে মসিহ্উদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর সূর্য দীঘল বাড়ী ও বাদল রহমানের এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী ছবি দুটির প্রতিটির জন্য আড়াই লাখ টাকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুদানের যাত্রা। মসিহ্উদ্দিন শাকের স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘নির্ধারিত টাকায় ছবিটা শেষ করতে না পেরে খুব হতাশায় পড়ে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত অনেক ধারদেনা করে, চাকরিবাকরি ছেড়ে ছবিটি বানাতে হয়েছিল।’
মাঝে অনিয়মিত হলেও ২০০৭ সাল থেকে প্রতি অর্থবছরে সাহিত্যনির্ভর গল্প ও চিত্রনাট্যে অগ্রাধিকার দিয়ে পাঁচ-ছয়টি ছবির জন্য অনুদান দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে একটি প্রামাণ্যচিত্র ও একটি শিশুতোষ ছবিও থাকে। গল্প এবং চিত্রনাট্য দেখে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ নির্ধারণ করেন কমিটির সদস্যরা। সর্বশেষ গত ৬ জুন চারটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রতিটির জন্য ৬০ লাখ টাকা এবং একটি প্রামাণ্যচিত্রের জন্য ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অর্থাৎ অনুদানের পরিমাণ আড়াই লাখ টাকা থেকে এখন ৬০ লাখ টাকায় এসে পৌঁছেছে।
তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনুদান পাওয়া চলচ্চিত্রের পরিচালক এফডিসিতে ছবি নির্মাণ করতে চাইলে সার্ভিস চার্জে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়। এ ছাড়া অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের গল্প লেখক ও চিত্রনাট্যকারকে দেওয়া হয় ৫০ হাজার টাকার উৎসাহ পুরস্কার। এমনকি শিল্পীদের শিডিউল পাওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত সমিতিগুলো। এ ছাড়া ছবি নির্মাণে সহ-প্রযোজক নেওয়ার সুযোগও থাকে।
অনুদানের পরিমাণ নিয়ে প্রযোজক বা পরিচালকেরা হতাশ হলেও অনুদান কমিটির সদস্যরা তা মনে করছেন না। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এবং অনুদান কমিটির সদস্য মোরশেদুল ইসলাম, মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বর্তমানে অনুদানের বরাদ্দকে মোটেও অপ্রতুল মনে করছেন না। নাসির উদ্দীন ইউসুফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অর্থের পরিমাণ জেনেই সবাই আবেদন করছেন, সে ক্ষেত্রে ছবি নির্মাণের ব্যাপারে নির্মাতাদের আরও বাস্তবমুখী হতে হবে। কলকাতায় অনেক কম বাজেটে ছবি নির্মাণ হয়।’
সরকারি অনুদান নিয়ে নির্মিত কয়েকটি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে কারিগরি মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রেক্ষাগৃহের মালিকেরা এগুলো প্রদর্শনে আগ্রহী হন না। কেন অনুদানের ছবিগুলো সিনেমা হলে চলে না? প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী শোয়েব রশিদ বলেন, ‘আমরা দর্শকের আগ্রহের কথা বিবেচনা করেই প্রেক্ষাগৃহে ছবি তুলি। অনুদানের ছবিগুলো সেই অর্থে সাড়া ফেলতে পারে না। এগুলো না হয় বাণিজ্যিক ছবি, না হয় আর্ট ফিল্ম।’
অনুদান কমিটির সদস্য নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ছবি দেখে মান নিশ্চিত হয়ে তারপর অনুদান দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি। বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুদানের ছবিগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশের বিভিন্ন জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে দেখানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ প্রস্তাবও কাজে লাগেনি।
গত ১০ বছরে অনুদান নিয়ে বানানো ছবির মধ্যে খুব কমসংখ্যকই দর্শকের মধ্যে সাড়া ফেলতে পেরেছে। এ প্রসঙ্গে কথা হলে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটি অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক বেলায়াত হোসেন বেশ কিছু ছবির নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘এই ছবিগুলো দেখে মনে হয়েছে পরিচালকেরা টেলিফিল্ম বানিয়েছেন, বড় পর্দার ছবি নয়। অনুদানের ছবিগুলো “অংশগ্রহণই বড় কথা”র মতো হয়ে যায়। দর্শকের মাঝে সাড়া ফেলতে পারে না।’
নির্মাতা ও অনুদান কমিটির সদস্য মোরশেদুল ইসলাম মনে করেন, অনেকেই আন্তরিকতা নিয়ে ছবি বানায় না। তিনি বলেন, ‘আমরা ধরেই নিই পাঁচটি ছবির অনুমতি দিলে তার মধ্যে দুটি মানসম্পন্ন হবে, বাকি তিনটি হবে না।’ (শেষ)
(প্রথম কিস্তি ছাপা হয়েছিল গতকাল)