চারুকলা কত বদলে গেছে!

কাঁধে ব্যাগ, চোখে চশমা। ষাটোর্ধ্ব মানুষটি গভীর মনযোগ দিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন জাতীয় চিত্রশালার নানা গ্যালারি। কখনো কখনো নিজের মোবাইলে ছবিও তুলছিলেন। একসময় বিস্ময় চোখেমুখে স্বগতোক্তি করলেন, কত বদলে গেছে চারুকলা!
বিগত দুই দশকে সারা বিশ্বেই চারুকলায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সৃজনশীল প্রয়াসে শিল্পীরা কাজ করেছেন নানা মাধ্যমে। যোগ হয়েছে ত্রিমাত্রিক উপস্থাপনের নানা বৈচিত্র্যময় আয়োজন। বেড়েছে পারফরম্যান্স আর্টের প্রচলন। সমাজ-পরিপার্শ্বের দৃশ্য, সংগতি-অসংগতি নিয়ে কখনো প্রচলিত প্রকাশরীতিতে, কখনো স্থাপনাচিত্র, কখনোবা ভিডিও আর্টের মাধ্যমে সমকালীন জীবনযাত্রা এবং জটিলতাকে তুলে ধরেছেন। অন্যান্য অঞ্চলের মতো এশিয়াতেও এর ঢেউ এসে লেগেছে। অনেকে এতে প্রভাবিতও হয়েছেন।

গত কয়েক দিন শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় ১৮তম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে এর নমুনা দেখা গেল। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে দেশ-বিদেশের শিল্পীরা মনোযোগ দিয়েছেন নিরীক্ষার দিকে। কেউ বিষয় নিয়ে, কেউ আবার মাধ্যম বা রং নিয়ে নিরীক্ষা করছেন। বিশেষ করে তরুণ শিল্পীরা নানা নিরীক্ষায়, উপকরণের বিচিত্র প্রয়োগে, করণ-কৌশলের প্রাচুর্যে প্রদর্শনী হলের স্পেসকে সমৃদ্ধ ও আলোকিত করেছেন।
সমসাময়িক বিচিত্র এবং ব্যতিক্রম কাজের বড় প্রমাণ মিলবে একাডেমির ৪ নম্বর গ্যালারিতে। এখানে চলছে বিশেষ প্রদর্শনী ‘বিন্দু বিসর্গ’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক বিশ্বজিৎ গোস্বামীর তত্ত্বাবধানে এখানে তরুণ ১২ জন শিল্পীর কাজ রয়েছে। বিশ্বজিৎ গোস্বামী জানালেন, তরুণেরা স্বাধীনভাবে এখানে কাজ করেছেন।
দর্শকের আগ্রহের তালিকায় আছে চিত্রশালা প্লাজার পারফরম্যান্স আর্ট প্যাভিলিয়ন। এশিয়ান বিয়েনালের ১৮তম আসরের নতুন সংযোজন পারফরম্যান্স আর্ট প্যাভিলিয়ন। শিল্পী মাহবুবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে প্লাজা গ্যালারিতে পারফরম্যান্স আর্টের প্রদর্শনীতে গত জুলাই মাসে শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিল্পের শহর ঢাকা’ আয়োজনটির আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্র দেখানো হচ্ছে।

পারফরম্যান্স আর্টের এ আয়োজনে বাংলাদেশি ১৬ জন শিল্পীর পাশাপাশি রয়েছে ১৪ জন বিদেশি শিল্পীর পারফরম্যান্স আর্টের আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্র। ইতিমধ্যে পারফরম্যান্স আর্টে সরাসরি অংশ নিয়েছেন গিম ওয়াং, আবু নাসের রবি, সৈয়দ মুহম্মদ জাকির, অর্পিতা সিংহ লোপা, ইয়াসমিন জাহান নূপুর, সঞ্জয় চক্রবর্তী, অসীম হালদার সাগর, সরকার নাসরিন টুনটুন, জুয়েল এ রব, প্রিচ আর সান। এর মধ্যে শিল্পী আবু নাসের রবির পারফরম্যান্স ছিল নিজের আত্মিক শান্তি ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর আলোকপাত। সৈয়দ মুহম্মদ জাকির পারফরম্যান্স করেছেন তাঁর মনের অনুভূতিগুলোর প্রতিফলনের অংশ হিসেবে। শিল্পী অসীম হালদার সাগর কাজ করেছেন মানব মনের বাস্তবতা ও তাঁদের চিন্তার জগতের যেই সংঘর্ষ সেই আঙ্গিককে আলোকপাত করে। শিল্পী অর্পিতা সিংহ লোপা কাজ করেছেন প্রতীকী ইঁদুর-বিড়ালের লড়াই নিয়ে। পারফরম্যান্স প্যাভিলিয়ন প্রতিদিনই জমজমাট থাকে। মঙ্গলবার সারা দিনই উল্লেখযোগ্য দর্শকের উপস্থিতি ছিল এখানকার পরিবেশনাগুলোতে। দর্শক আসছেন, শিল্পকর্ম দেখছেন। পছন্দ হলে কেউ কেউ শিল্পকর্ম সঙ্গে রেখে নিজেকেও ধারণ করছেন মোবাইলের ক্যামেরায়।

বুধবার পর্যন্ত চলবে পারফরম্যান্স আর্টের এই প্রদর্শনী। বৃহস্পতিবার শিল্পী মাহবুবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হবে পারফরম্যান্স আর্ট কর্মশালা।
সোমবার ছিল এ আয়োজনের তৃতীয় দিন। চারুকলা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নাচ-গানের সংযোজনে আয়োজনটিকে উৎসবে পরিণত করেন আয়োজকেরা। এদিন শেষ হয়েছে দুই দিনের ‘আর্ট অ্যান্ড কনটেমপোরারি ন্যারেটিভস’ শিরোনামের সেমিনার ও ‘আর্ট, পেডাগোজি অ্যান্ড প্রমোশন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা। দুই পর্বে বিভক্ত এ আয়োজনের সকালের পর্ব ছিল জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে। আলোচনায় অংশ নেন শিল্পী রশিদ আমিন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক শায়লা শারমিন ও চিত্র সমালোচক মঈনুদ্দিন খালেদ। এ পর্ব সঞ্চালনা করেন চিত্র সমালোচক কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। বিকেলের পর্বটি ছিল জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে। এতে আলোচনায় অংশ নেন জাপানের প্রখ্যাত শিল্পী ও টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফাইন আর্টস অ্যান্ড মিউজিকের ইমেরিটাস অধ্যাপক তেতসুইয়া নোদা, আন্তর্জাতিক চিত্র সমালোচক সংস্থার সভাপতি মারেক বার্টেলিক এবং ডেবরাহ ডায়ার ফ্রিজেল। এ পর্ব সঞ্চালনা করেন তানজিম ইবনে ওহাব। সমাপনী বক্তব্য দেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখতে দেখতে চারুকলা মিলনায়তনের সামনে করিডরে দেখা হলো শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সঙ্গে। আয়োজন নিয়ে সন্তুষ্ট তিনি। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চারুশিল্পীদের মতবিনিময়ের অনন্য পটভূমি হিসেবে “দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী বাংলাদেশ” বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও শিল্প-সমঝদারদের বন্ধুত্বের সেতুবন্ধরূপে তৈরি করেছে। এখানে আমরা নানা দেশ ও সংস্কৃতির ভেতর থেকে ওঠে আসা শিল্পী ও শিল্প-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাবের এই আদান প্রদানের সুফল আমরা দেখতে পাচ্ছি।’
স্কুলের পোশাক গায়ে একদল শিক্ষার্থীকে দেখা গেল দল বেঁধে ঢুকছে চিত্রশালায়। একাডেমির জনসংযোগ কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ জানালেন, শিশুদের জন্য এ বছর প্রথমবারের মতো শিশু কর্নার রাখা হয়েছে প্রদর্শনীতে। শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় এখানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের আনা হয়। ওরা আসে, প্রদর্শনী দেখে। শিশু কর্নারে গিয়ে নিজেদের পছন্দমতো ছবি আঁকে।

মঙ্গলবার বিদেশি শিল্পীরা দল বেঁধে নৌভ্রমণে গেছেন। শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে ঢাকার সদরঘাট থেকে ভোরেই যাত্রা করেছেন শিল্পীরা। দুপুর পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন নদীতে। কেউ কেউ জলযানে বসেই বাংলার প্রকৃতিকে এঁকেছেন নিজের ক্যানভাসে। কেউ নিজের ক্যামেরায় ধরে রেখেছেন সেই চিত্র। নৌবিহারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। সব মিলে মঙ্গলবার অন্য রকম দিন পার করেছেন বিদেশি শিল্পীরা।

জাতীয় চিত্রশালার বাইরে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রদর্শনী উপলক্ষে অস্থায়ী ভাস্কর্য পার্ক চালু করা হয়েছে। এখানে স্থান পেয়ে নতুন পুরোনো বেশ কিছু ভাস্কর্য। দেশের বিশিষ্ট ভাস্কর নভেরা আহমেদ, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, নিতুন কুন্ডু, আনোয়ার জাহান, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ও ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে উৎসর্গ করা হয়েছে অস্থায়ী ভাস্কর্য পার্কটিকে।
মাসব্যাপী এ আয়োজনে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।