লোকার্নো যাত্রার তিন বছর

এ বছর সুইজারল্যান্ডের মর্যাদাপূর্ণ উৎসব লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের ওপেন ডোরস ল্যাব কার্যক্রমের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলাদেশি প্রযোজক আরিফুর রহমান। ১ থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত চলা লোকার্নো উৎসবের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেন তিনি।
তিন বছর আগে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে লোকার্নো উৎসবের প্রতিনিধি পাওলো বারতোলিন এসেছিলেন—দক্ষিণ এশীয় সিনেমার জন্য একটি নতুন প্রোগ্রাম বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকারদের কাছে পরিচিত করানোর জন্য। লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের অধীনে এই প্রোগ্রামের নাম ‘ওপেন ডোরস’। যেসব দেশে বাণিজ্যিক ধারার বাইরে স্বাধীন ধারায় ছবি নির্মাণ সেভাবে হয় না, সেসব দেশের পরিচালক ও প্রযোজকদের জন্য এই কার্যক্রম। এর তিনটি অংশ। ওপেন ডোরস হাবে পরিচালকদের নির্মিতব্য প্রজেক্ট জমা দিতে হয়। সেখান থেকে সেরা প্রকল্প পায় অর্থ পুরস্কার। বিশ্ব চলচ্চিত্রবাজার সম্পর্কে ধারণা দিতে ওপেন ডোরস ল্যাবে প্রযোজকদের কর্মশালা করা হয়। আর ওপেন ডোরস স্ক্রিনিংয়ে নির্মাতাদের ছবি দেখানো হয়। ২০১৬ থেকে তিন বছরের জন্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোকে এই কার্যক্রমের জন্য বাছাই করে।
ওই সময় আমি ও বিজন ইমতিয়াজ আমাদের প্রথম ছবি মাটির প্রজার দেশের কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছি। স্বাধীন ছবি বানাতে গিয়ে প্রতি পদে আমরা ঠোকর খাচ্ছিলাম। বিশেষ করে বিশ্ব চলচ্চিত্রবাজারের উপযোগী একটি ছবি তৈরির কোনো দিকনির্দেশনাই আমাদের কাছে ছিল না।
বিজন ছিল ছবিটির পরিচালক, আমি প্রযোজক। প্রযোজকের আসল কাজ কী, সেটা বুঝতে গিয়ে রীতিমতো খাবি খাচ্ছিলাম। লোকার্নোর এই প্রোগ্রাম সম্পর্কে জেনে খুবই উৎসাহ পেলাম। সে বছর ‘বাংলাদেশ’ হচ্ছে ফোকাস কান্ট্রি। পরবর্তী ক্রিপ্ট মানিব্যাগ-এর জন্য আমরা ওপেন ডোরস হাবে আবেদন করলাম। সেবার বাংলাদেশ থেকে হাবে দুজন নির্বাচিত হলেন, কিন্তু আমরা বিফল হলাম। পরের বছরও আমাদের কাজটি নির্বাচিত হলো না।
আর এক বছর বাকি। প্রতিবার আবেদন করতে অনেক পেপার ওয়ার্কস করতে হয়—একবার ভাবলাম, হাল ছেড়ে দেব?
এরপর ২০১৭ সালে আমি এশিয়ান ফিল্ম একাডেমির প্রডিউসিং ফেলো নির্বাচিত হলাম। সেখানে এক মাসের একটি প্রশিক্ষণ শেষ করলাম। আমি ও বিজন গোয়া ফিল্ম বাজারে গেলাম আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের লাইভ ফ্রম ঢাকা নিয়ে। তখন লোকার্নোর প্রোগ্রামার পাওলোর সঙ্গে আমাদের আবার দেখা হলো। কথা হলো সাদের ছবিটি ওপেন ডোরস স্ক্রিনিংয়ে দেখানো যায় কি না।
কথা প্রসঙ্গে পাওলো বলেছিলেন, ‘ফিল্ম প্রোগ্রামারদের কাজ কি জানো? আমরা একেকজন ফিল্মমেকারের পেছনে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় দিই, তাঁদের ফলো করি।’ লোকার্নোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়ে গেল। এবার ল্যাবের জন্য প্রযোজক হিসেবে আবেদন করলাম। মনে আছে, মাটির প্রজার দেশে মুক্তির দিন লোকার্নো থেকে জানানো হলো অবশেষে যাচ্ছি লোকার্নো।
শেষ বছর ওপেন ডোরস স্ক্রিনিংয়ের জন্য লাইভ ফ্রম ঢাকাও নির্বাচিত হলো। কীভাবে গুপী বাঘা প্রডাকশনস ছবিটির সঙ্গে যুক্ত হলো, ফরাসি কোম্পানি স্ট্রে ডগস কীভাবে বিশ্ব পরিবেশক হলো—এবার সেসব অভিজ্ঞতাও ভাগাভাগি করেছি। ছিলাম স্ট্রে ডগসের প্রতিষ্ঠাতা ন্যাথান ফিশার, বিজন ও আমি। সেশনটি সঞ্চালনা করেন ফরাসি প্রযোজক ডোমিনিক উইলস্কি।
১০ দিনের উৎসবে ৭ দিনের ওপেন ডোরস ল্যাবে ছিল জমজমাট একটি রুটিন। কার্যক্রম সকালে শুরু হয়ে কখনো কখনো চলেছে রাত ১১টা পর্যন্ত। যৌথ প্রযোজনায় একজন প্রযোজকের কী কাজ, তার ধারণা পাওয়া গেছে। গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো ‘প্রজেক্ট পিচিং’। প্রযোজকের বড় কাজ, তাঁর প্রজেক্ট দক্ষতার সঙ্গে উপস্থাপন করা। প্রজেক্ট ইন্টারেস্টিং হলে অনেকেই আগ্রহ দেখাবেন। তখন প্রযোজককে চৌকস সিদ্ধান্ত নিতে হয় কাকে হ্যাঁ বলা হবে। পরিবেশনা ও বিক্রয় ধাপেও হিসাব-নিকাশ অনেক বুঝেশুনে করতে হবে। এসবই বিস্তারিত জেনেছি এ প্রোগ্রামে।
বিশ্বের নানা প্রান্তের ফিল্মমেকাররা তাঁদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। ছিল দ্য টুরিন হোর্স ছবির প্রযোজক মাইকেল হিগেমান ও ওয়াল্টজ উইথ বশির-এর প্রযোজক রোমান পলের মাস্টারক্লাস। বড় সব উৎসবের প্রোগ্রামারদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। ইউরোপিয়ান ফিল্ম মার্কেট, কো-প্রডাকশন মার্কেট, ল্যাব ও প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে।
এবার হাবে ছিল মেহেদী হাসান ও রুবাইয়াৎ হোসেনের স্যান্ড সিটি প্রকল্পটি। স্ক্রিনিংয়ে ফিচার ফিল্ম লাইভ ফ্রম ঢাকার সুইস প্রিমিয়ার নিয়ে ছিলেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, বিজন ইমতিয়াজ, এহসানুল হক বাবু এবং শর্ট ফিল্ম ডেথ অব আ রিডার নিয়ে ছিলেন মেহেদী। অং রাখাইন ছিলেন দ্য লাস্ট পোস্ট অফিস-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার নিয়ে।
একটি ব্যাপার খুব ইন্টারেস্টিং ছিল—নিজের দেশের এই ফিল্মমেকারদের আন্তর্জাতিক এই প্ল্যাটফর্মে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছি, তাঁদের সবার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এবারই প্রথম দেখা হলো, এমন কয়েকজনও ছিলেন। আমি যেহেতু হাবে ছিলাম না, তাই কোনো প্রতিযোগিতা করতে হয়নি। কিন্তু প্রযোজকদের সঙ্গে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ মিটিংয়ে আমাদের পরবর্তী ফিকশন প্যারাডাইস অনানুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেছি আমরা।
লেখক: প্রযোজক, মাটির প্রজার দেশে, লাইভ ফ্রম ঢাকা, গুপী বাঘা প্রডাকশনস