জার্মানিতে বিরোধিতার মধ্যেও উন্মোচিত হতে যাচ্ছে কার্ল মার্ক্সের মূর্তি

জার্মানির ট্রিয়েরে আজ শনিবার কার্ল মার্ক্সের এই মূর্তিটি জনসমক্ষে প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ছবি: এএফপি
জার্মানির ট্রিয়েরে আজ শনিবার কার্ল মার্ক্সের এই মূর্তিটি জনসমক্ষে প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ছবি: এএফপি

চীনের কাছ থেকে উপহার পাওয়া কার্ল মার্ক্সের দীর্ঘ মূর্তিটি অবশেষে জার্মানির ট্রিয়েরে উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। সাম্যবাদী নেতা কার্ল মার্ক্সের ২০০তম জন্মবার্ষিকীতে মূর্তিটি তাঁর জন্মস্থান ট্রিয়ের শহরে আজ শনিবার উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এর আগে নানা বিরোধিতার মুখে তা জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়নি।

দেশান্তরী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ও মার্ক্সবাদের প্রবক্তা কার্ল মার্ক্সকে নিয়ে ইউরোপে বিতর্ক থাকলেও চীনে তিনি মর্যাদার উচ্চ আসনে রয়েছেন। চীনের সরকারব্যবস্থা পরিচালিত হয় মার্ক্স তত্ত্বকে অনুসরণ করে। চীনের শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের বেশির ভাগের জন্য মার্ক্সবাদের ওপর পড়াশোনা করা বাধ্যতামূলক।

১৮১৮ সালের ৫ মে ট্রিয়ের শহরে জন্ম নেন কার্ল মার্ক্স। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ তিনি মারা যান। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে হাইগেট সেমেটারিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

মার্ক্সের মূর্তিটি উন্মোচন করা নিয়ে আজ ট্রিয়ারে মার্ক্সবিরোধীরা সমাবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সমাজবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধী দুই পক্ষই এতে যুক্ত হয়েছে। এর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে চীনে নিষিদ্ধ বৌদ্ধধর্মভিত্তিক সংগঠন ফালুন গং আন্দোলনকারীরা।

জার্মান বার্তা সংস্থা ডিপিএর বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। ট্রিয়ারের মুখপাত্র মিখাইল স্কিমিটজ্‌ বলেছেন, ‘আপনি যদি কার্ল মার্ক্সের সমালোচনা করতে চান, আপনাকে তা করার জন্য স্বাগত জানাই। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই সহিংসতা বা ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ায় করা যাবে না।’

মার্ক্স সাম্যবাদী বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, পুঁজিবাদী সমাজে বিচ্ছিন্ন কর্মজীবীশ্রেণি গড়ে ওঠে। এর বিপরীতে সাম্যবাদী সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পৃক্ত কর্মজীবী সমাজ গড়ে উঠবে। এর ফলে দূর হবে শ্রেণিবৈষম্য। জার্মান এই দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্ক্স উনিশ শতকের মাঝামাঝি ‘দাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থ রচনা করেন। সেখানে বলা হয়, কীভাবে পুঁজিবাদপদ্ধতি কাজ করে এবং কেন করে। সেই গ্রন্থে তিনি তাঁর মতবাদকে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় বিশ্লেষণ করেছেন।

কার্ল মার্ক্সের মতবাদ অনুসারে পরিচালিত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলেও চীনে তা দাপটের সঙ্গে টিকে রয়েছে। জার্মানির পূর্বাঞ্চলের অর্ধেক ১৯৪৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ব্লকে ছিল। তবে জার্মানির ওই অংশ পশ্চিমাংশের চেয়ে বেশি দরিদ্র ছিল। ১৯৯০ সালে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি এক হয়ে যায়।

মূর্তিটি নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে ট্রিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৫ ফুট উচ্চতার মূর্তিটি চীনের কাছ থেকে নেওয়ার পর থেকে দুই বছর ধরে এ নিয়ে বিতর্ক চলছে। অনেকের মতে, চীনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে এই মূর্তিটি নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

কার্ল মার্ক্স রচিত ‘দাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থ প্রদর্শন করা হয় জার্মানির ট্রিয়েরে। ছবি: রয়টার্স
কার্ল মার্ক্স রচিত ‘দাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থ প্রদর্শন করা হয় জার্মানির ট্রিয়েরে। ছবি: রয়টার্স

গতকাল শুক্রবার জার্মানির লেখকদের সংগঠন পেন মূর্তিটি উন্মোচনের বিরোধিতা করে বলেছে, চীনের একদলীয় শাসনবিরোধী লেখক নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত লু সিয়াওবোর বিধবা স্ত্রী লু সিয়াকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত কার্ল মার্ক্সের এই মূর্তি উন্মোচন করা উচিত হবে না। লু সিয়াকে ২০১০ সাল থেকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ নেই। সরকারের বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করায় নোবেলজয়ী লু সিয়াওবোকে বন্দী করা হয়। লিভার ক্যানসার ধরা পড়ার পর চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার কিছুদিন পর ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই তিনি মারা যান।

ট্রিয়েরের মেয়র ওলফ্রাম লাইবে বলেছেন, ‘বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে আমরা মূর্তিটি গ্রহণ করেছি। কার্ল মার্ক্স সম্পর্কে জানতে এই মূর্তি লোকজনকে উৎসাহিত করবে। এ বিষয়ে কিছু মতামত ও সংস্কারের ক্ষেত্রে হয়তো পুনর্বিবেচনা করা হবে।’ তিনি জানান, জার্মানিতে কার্ল মার্ক্সের আরও মূর্তি রয়েছে। যে বাড়িতে তিনি জন্ম নিয়েছেন, সেখানে এবং রাজধানী বার্লিনের পার্কে তাঁর মূর্তি রয়েছে। চীনের ৫০ হাজার পর্যটকসহ বিভিন্ন দেশের ৪৫ লাখ পর্যটক ট্রিয়ের ঘুরতে আসেন।