তালেবানের বন্দুকের মুখে চলছে ক্রিকেট!

নিজেদের মাটিতে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারে না দেশটি। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর অভিষেক টেস্টও খেলতে হয়েছে বিদেশের স্টেডিয়ামে। কারণ, বুলেট-বোমার ভয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগান মুলুকে খেলতেই আসে না কেউ! এভাবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে খেলে দেশের মানুষের মুখে ক্ষণিকের জন্য হাসি ফোটান আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররা। গুলি আর বোমায় যেখানে কান পাতলেই কান্নার শব্দ শোনা যায়, সেখানে উৎসবের আমেজ সত্যিই দুর্লভ!
সদ্যই ক্রিকেটের অভিজাত ক্লাবের সদস্য হয়েছে আফগানিস্তান। গত ১৪ জুন ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলেছে। সাদা পোশাকে খেলতে নামার অনেক আগেই রঙিন পোশাকে ক্রিকেট বিশ্বে চমক দেখিয়েছেন রশিদ খান-শাপুর জাদরানরা। তবে আফগানদের ক্রিকেট খেলার ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৯৫ সাল থেকে দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাট-বলের চর্চা শুরু। এর ২০ বছরের মাথায় ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নেয় আফগানিস্তান। এরই পথ ধরে এবার এল টেস্ট স্ট্যাটাস।
তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে ক্রিকেট খেলা চালানো বেশ কঠিন। বিখ্যাত ক্রিকেটারদের জীবনীতে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার কথা শোনা গেছে। কেউ হয়তো দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, কেউ যুঝেছেন ইনজুরির সঙ্গে। কিন্তু আফগান ক্রিকেটারদের মতো বন্দুক ও আত্মঘাতী বোমার সঙ্গে লড়াই করার অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্য কোনো ক্রিকেটারের আছে বলে মনে হয় না। দেশটিতে এখন একটি স্বাধীন সরকার আছে বটে। কিন্তু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তালেবানের ধারাবাহিক চোরাগোপ্তা হামলা এবং অনবরত হুমকিতে সেই সরকার জেরবার! এবিসি নিউজের খবর, ক্রিকেটকে সুনজরে দেখে না তালেবান ও অন্য ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা। ব্যাট-বলের লড়াইকে নিষিদ্ধ করেছে তারা। মেয়েদের ক্রিকেট তো নৈব নৈব চ। তারপরও আফগান ভ্যালিতে স্থানীয়ভাবে খেলা চলছে, ওভার বাউন্ডারি বা স্টাম্প উপড়ে গেলে হচ্ছে উল্লাস।
আফগানিস্তানে ক্রিকেটের গোড়াপত্তনের ইতিহাস একটু ভিন্ন। ভারত-পাকিস্তান বা বাংলাদেশে ক্রিকেটের শুরুটা হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসকদের হাত ধরে। কিন্তু আফগানিস্তানে তা নয়। ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালানোয় দেশটির অনেক মানুষকে সীমান্তবর্তী দেশ পাকিস্তানে শরণার্থী হিসেবে যেতে হয়েছিল। ওই সময়ে পাকিস্তান থেকেই ক্রিকেট খেলা শিখে আসে আফগানরা। এরপর আফগানিস্তানে খেলাটির চল শুরু হয়, আর ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হতে থাকে।

আফগান ক্রিকেটের চমক কী?
চমক শব্দটি এলে প্রথমেই আসবে রশিদ খানের নাম। ১৯ বছর বয়সী এই লেগ স্পিনার ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সৌজন্যে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন। এক অর্থে আফগান ক্রিকেটের পোস্টার বয় তিনি। লেগ স্পিনে তাঁর বলের টার্ন, বাউন্স ও বৈচিত্র্যে ধোঁকা খাচ্ছেন অনেক বিশ্বখ্যাত ব্যাটসম্যান। কিছুদিন আগেই স্রেফ নাকানি-চুবানি খেল বাংলাদেশ।
তবে নিন্দুকদের কথা, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বেশ কার্যকর হলেও সাদা পোশাকে রশিদ খান ততটা ভয়ংকর নন। প্রথম টেস্টে ভারতীয় বাঁহাতি ব্যাটসম্যান শিখর ধাওয়ানের হাতে বেধড়ক মারও খেয়েছেন তিনি। তবে মাত্রই তো পা ফেললেন ক্রিকেটের কুলীন ক্লাবে, সময় গেলেই বোঝা যাবে রশিদ খানের অবস্থা কী হয়!
ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, টেস্টে অভিষেক সমস্যাসংকুল আফগানিস্তানের জন্য ঐতিহাসিক এক মুহূর্ত। এরই মধ্যে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ক্রিকেটের চর্চা ছড়িয়ে পড়েছে, গড়ে উঠছে ছোট ছোট ক্রিকেট একাডেমিও।
শুধু রশিদ খানই নন, আফগানদের আরও কিছু উদীয়মান ক্রিকেট তারকা আছে। দলটির স্পিন আক্রমণ সত্যিই বৈচিত্র্যপূর্ণ। কিশোর জাহির খান একজন বাঁহাতি রিস্ট স্পিনার। অলরাউন্ডার মোহাম্মদ নবী ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি অফ স্পিনেও হাত ঘোরান ভালোই। পেস বোলিংয়ে নেতৃত্ব দেন শাপুর জাদরান। উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ শাহজাদ গায়ের জোরে বল পিটিয়ে ছাতু বানাতে পারেন। আসগার স্টানিকজাই সামলান মিডল অর্ডার। অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যানকে টেস্ট সংস্করণের জন্য সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা।
এক কথায় আফগানিস্তানের ক্রিকেট দল হেলায় উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অর্থের সমাগম। ইকোনমিস্ট বলছে, শুধু আইপিএল খেলেই এ বছর ১৪ লাখ ডলার পাচ্ছেন রশিদ খান। তাঁর এই বেতন আফগানিস্তানের মাথাপিছু আয়ের চেয়ে আড়াই হাজার গুণ বেশি! আফগানিস্তানে আর কোনো পেশায় এত বিপুল অঙ্কের অর্থ উপার্জনের সুযোগ নেই। দেশটিতে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা দিনকে দিন বাড়তে থাকার এটিও একটি কারণ। অনেক আফগান মা-বাবা এখন ছেলেকে ক্রিকেট একাডেমিতে পাঠাচ্ছেন ভাগ্য বদলের আশায়।

তালেবান কী চায়?
টেস্ট স্ট্যাটাস মর্যাদা পাওয়া ১২তম দেশ হলো আফগানিস্তান। দেশটিতে খেলাধুলা চর্চায় সবচেয়ে বড় বাধা হলো তালেবান ও ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা। সে ক্ষেত্রে ক্রিকেটও ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে তালেবানের অনুশাসনে খেলাটি নিষিদ্ধ। তবে জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটারে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় ক্রিকেটের বিরুদ্ধে তালেবানের সুর একটু নরম।
‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদনে জানা যায়, গত বছর আফগানিস্তানের জাতীয় ক্রিকেটার শাপুর জাদরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। চার বছর আগে সন্ত্রাসীদের খপ্পরে পড়েছিলেন মোহাম্মদ নবীও। ওই সময় তাঁর বাবাকে অপহরণ করেছিল মৌলবাদীরা। এ বছরও হামলা হয়েছে আফগান ক্রিকেটের ওপর। গত ১৯ মে রাতে নানগারহার প্রদেশের জালালাবাদে স্থানীয়ভাবে একটি ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল। রমজান মাস উপলক্ষে একটু রাত করেই ম্যাচ শুরু হয়েছিল, যাতে খেলোয়াড়েরা ইফতার করে খেলায় অংশ নিতে পারেন। খেলা শুরুর পর সেখানে গুনে গুনে তিনটি বোমা ফাটায় সন্ত্রাসীরা। এতে নিহত হন কমপক্ষে আটজন, আহত হয়েছেন পঞ্চাশেরও বেশি মানুষ।
এবিসি নিউজ বলছে, এত হামলা করেও ঠেকানো যাচ্ছে না আফগান তরুণ ক্রিকেটারদের। কারণ, এই লড়াইয়ে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকাটাও জড়িয়ে গেছে। সেই সঙ্গে আফগানিস্তানের বিভিন্ন উপজাতি বা গোষ্ঠীর মানুষকে একত্র করার মন্ত্রও এই ক্রিকেট।

ইদানীং ক্রিকেট ও ফুটবলকে এক চোখে দেখছে না তালেবান। ফুটবলে হাফ প্যান্ট পরে খেলতে হয় বলে তালেবানের নীতিনির্ধারকদের কাছে খেলাটি পছন্দের নয়। তবে ক্রিকেটে যেহেতু ফুল প্যান্ট ও টি-শার্ট পরা যায়, তাই এই খেলার প্রতি ক্ষোভ কিছুটা কম তাঁদের! ইকোনমিস্ট বলছে, এখন ক্রিকেটকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক সুবিধাও পেতে চাইছে তালেবান। যেহেতু এই খেলার জনপ্রিয়তা বাড়ছে, তাই পারতপক্ষে ক্রিকেট ম্যাচে হামলা চালিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চাইছে না তারা। শুধু কি তাই, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতীয় দল উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেলে শুভেচ্ছাও জানাচ্ছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি!
তবে আফগান নারীদের ভাগ্য এতটা সুপ্রসন্ন নয়। রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে তালেবানদের উচ্ছেদের পর একটি জাতীয় নারী ক্রিকেট দল গঠন করা হয়েছিল বটে। কিন্তু তালেবানের অব্যাহত হুমকির মুখে ২০১৪ সালে সেটি ভেঙে দিতে বাধ্য হয় আফগান সরকার।
আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলতে নামার সময় ক্রিকেটারদের সব সময় নির্ভার থাকার পরামর্শ দেন কোচরা। আফগান ক্রিকেটারদের জন্য গুলি, বোমা আর রক্ত ভুলে সবুজ মাঠে খেলতে নামা কতটা কঠিন—সেটি বুঝতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। দৈনিক পত্রিকার আন্তর্জাতিক পাতায় কিছুদিন চোখ রাখলেই বোঝা যাবে আফগানিস্তানের সহিংসতার মাত্রা। ২২ গজে রশিদ-নবীদের নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার জন্য তাই একমাত্র অনুপ্রেরণা দেশবাসীর হাসিমুখ। আফগানিস্তান জয় পেলেই যে উৎসব হয় কাবুলে, রক্ত-অশ্রু মুছে আফগানদের মুখে ফোটে হাসি।