ভারতের পশ্চিমবঙ্গ-ঝাড়খন্ড সীমান্তজুড়ে আবারও মাওবাদী তৎপরতা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খন্ড রাজ্যের সীমান্তজুড়ে আবারও মাওবাদী তৎপরতা শুরু হয়েছে। ওই এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত দুই মাসে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে তিনবার সংঘর্ষ হয়েছে মাওবাদী গেরিলাদের।
মাওবাদীদের এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশ। তাঁর বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা টাউনে।
পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল মাওবাদী-অধ্যুষিত এলাকা। পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া আর বাঁকুড়া জেলায় এই জঙ্গলমহলের অবস্থান। পাশেই রয়েছে ঝাড়খন্ড রাজ্যের মাওবাদী প্রভাবিত অঞ্চল ঘাট শিলা। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় আসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। এর আগে একটানা পশ্চিমবঙ্গে শাসনক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। বামফ্রন্টের শাসনের শেষ দিকে, বিশেষ করে ২০০৬ সালের দিকে পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলে তৎপর হয় মাওবাদীরা।
বামফ্রন্টের শাসনের সময় মাওবাদীরা পরোক্ষভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মূল কান্ডারি তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে। ফলে এই রাজ্যে জঙ্গলমহলসহ বিভিন্ন এলাকায় বেড়ে যায় মাওবাদী তৎপরতা। মাওবাদীরাও পশ্চিমবঙ্গে শাসনক্ষমতা থেকে বামফ্রন্টকে তাড়ানোর জন্য মাঠে নেমে পড়ে। একপর্যায়ে তারা মমতার পাশে এসে দাঁড়ায়। তৃণমূলকে ২০১১ সালে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে সমর্থনও দেয় তারা।
মাওবাদী তৎপরতা ঠেকাতে তৎকালীন বাম সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলেও তাতে কাজ হয়নি; বরং বেড়ে যায় মাওবাদী তৎপরতা। এই তৎপরতা রোধে নিয়োগ করা হয় যৌথ বাহিনী। মমতা ঘোষণা দেন, তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে মাওবাদীদের সমস্যা সমাধান করবেন।
এদিকে ২০১১ সালে বামফ্রন্টকে পরাজিত করে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এসে মাওবাদীদের জীবনের মূল¯স্রোতে ফিরে আসার ডাক দেন। মাওবাদীদের পুনর্বাসনের নানা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এতে মাওবাদীদের একাংশ মমতার ডাকে সাড়া দেয়। মমতা মাওবাদীদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি তাঁদের অনেককে কারাগার থেকে মুক্তি দেন। এতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি মাওবাদীদের একাংশ। তাদের দাবি ছিল, কারাগারে বন্দী মাওবাদীদের মুক্তি দিতে হবে। মমতা সেই দাবি পূরণ না করায় মাওবাদীরা মমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করে।
পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে থাকা মাওবাদী শীর্ষ নেতা কোটেশ্বর রাও ওরফে কিষেনজি জঙ্গলমহলে শুরু করেন মাওবাদী তৎপরতা। ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বুড়িশোল জঙ্গলে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে এক সংঘর্ষে কিষেনজি মারা যান। মাওবাদীরা দাবি করেছিল, তাদের দলের একজন বিশ্বাসঘাতকতা করে কিষেনজির অবস্থান জানিয়ে দিলে পুলিশ কিষেনজিকে গ্রেপ্তার করে এবং পরে হত্যা করে ‘সংঘর্ষে মৃত্যু’ বলে ঘোষণা করে।
কিষেনজির মৃত্যুর পর পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদীদের তৎপরতা অনেকটাই থেমে যায়। মাওবাদীরাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তবে এখন পশ্চিমবঙ্গের আকাশ মাওবাদীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি এখন পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদীদের জড়ো করে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছেন। অবস্থান নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের পাশের রাজ্য ঝাড়খন্ডে। ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল এলাকার সীমান্তজুড়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছেন। আকাশের সঙ্গে রয়েছে পুরুষ ও নারী গেরিলা দল। একে সিরিজের রাইফেল, এসএলআর, কারবাইন, থ্রি নট থ্রির মতো আগ্নেয়াস্ত্র, মাইন ও গোলাবারুদ রয়েছে এই দলের সঙ্গে।
ঝাড়খন্ড পুলিশ জানিয়েছে, গত জুন ও জুলাই মাসে ঝাড়খন্ডের ঘাট শিলায় আকাশের দল তিনবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয় যৌথ বাহিনীর সঙ্গে। এ ছাড়া গত ১১ জুলাই ঝাড়খন্ডের সীমান্ত এলাকার বুধাবুধির জঙ্গলে আকাশ বাহিনীর সঙ্গে এক সংঘর্ষে মারা যান আধা সামরিক বাহিনী সিআরপিএফের জওয়ান নির্মল ঘোষ।
এই ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খন্ডের পুলিশ। ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গের যৌথ বাহিনী আকাশকে ধরার জন্য চিরুনি তল্লাশি শুরু করেছে। পুলিশের ধারণা, আকাশ এখন ঝাড়খন্ড ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলে আত্মগোপন করেছেন। ইতিমধ্যে সিআরপিএফের মহাপরিচালক আর আর ভাটনগর এক বৈঠকে এই দুই রাজ্যের জঙ্গলমহলে সতর্কতা জারি করে নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন।