কেরালা: কে দেবে ত্রাণ - বিতর্কে রাজনীতি

কেরালার বন্যা–পরবর্তী ত্রাণকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনীতির লড়াই। সেই লড়াই ঘিরে উঠে গেছে উচিত-অনুচিতের প্রশ্ন। এবং ক্রমে বড় হয়ে উঠছে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত। এতটাই যে কেরালার বিজেপি রাজনীতিকেরাই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, বৈদেশিক ত্রাণের আবেদন অগ্রাহ্য করা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে ঠিক হচ্ছে কি না।
যে সিদ্ধান্ত ঘিরে এই প্রশ্ন, তা আঠারো-বিশ বছরের পুরোনো। অটল বিহারি বাজপেয়ির শাসনে ঠিক হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-বিপর্যয়ে ভারত আর বহির্বিশ্বের সাহায্য প্রত্যাশা ও গ্রহণ করবে না। অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়ের মোকাবিলা ভারত নিজেই করতে সক্ষম। মনমোহন সিং সরকার সেই নীতিকে ঘোষিতভাবে জাহির করে। ২০০৪ সালের সুনামির পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ত্রাণের আরজি মনমোহন-সরকার বিনম্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ভারত গোটা পৃথিবীতে এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, অর্থনৈতিক দিক থেকে এই দেশ নিজেই এক শক্তি। বিপর্যয় মোকাবিলায় অন্যের সহায়তার প্রয়োজন নেই।
সেই থেকে ভারতে যতগুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছে, ২০১৩ সালের উত্তরাখন্ডের বন্যা ও ভূমিধস কিংবা তার পরের বছরের কাশ্মীরে অভূতপূর্ব প্লাবন, কোনো ক্ষেত্রেই ভারত বিদেশি ত্রাণ চায়নি। গ্রহণও করেনি। বরং বহুবার অন্যদের সাহায্যে এগিয়ে গেছে। উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে।
এত দিন এই নীতি নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। কেরালার বিপর্যয় প্রশ্নটিকে সামনে এনে দিল।
গত ১০০ বছরে যা ঘটেনি, এই বছর কেরালায় তা ঘটেছে। অবিরাম ধারাপাত, বিপুল বন্যা ও ভয়ংকর ভূমিধস ‘ঈশ্বরের আপন দেশকে’ রেয়াত করেনি। শেষ পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ কত দাঁড়াবে কেউ জানে না। যদিও রাজ্য সরকারের প্রাথমিক হিসেব, রাজ্য পুনর্গঠনে কমবেশি ২০ হাজার কোটি রুপি প্রয়োজন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও সিপিআই (এম) নেতা পিনারাই বিজয়ন শুধু ত্রাণের জন্যই চেয়েছেন ২ হাজার ২০০ কোটি রুপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার দিয়েছে ৬০০ কোটি, শুল্কমুক্ত ত্রাণ সামগ্রী ও প্রয়োজনে আরও আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি। গোটা দেশ অবশ্য এগিয়ে এসেছে। বিভিন্ন রাজ্য সরকার দশ-বিশ কোটি রুপি সাহায্যের কথা জানিয়েছে। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের মতো করে ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহে নেমে পড়েছে। সাধারণ মানুষ রুপি দিচ্ছেন বিভিন্ন ত্রাণ তহবিলে। সক্রিয় বলিউড। অভিনেতা–অভিনেত্রীরা দুহাত উপুড় করে সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন।
বিতর্ক উঠেছে শুধু বিদেশি ত্রাণকে কেন্দ্র করে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিতে কেরালার মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। এই বিপর্যয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মহম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম। ১০ কোটি ডলার বা ৭০০ কোটি রুপির সাহায্য নেওয়ার জন্য ভারত সরকারকে তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন। কাতার দিতে চেয়েছে ৩৫ কোটি রুপি, মালদ্বীপ ৫০ হাজার ডলার। ধন্যবাদ জানিয়ে ভারত তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিবাদ। কেরলের অর্থমন্ত্রী টমাস আইজাক বলেছেন, ‘চাইলাম ২ হাজার কোটি, কেন্দ্র দিল মাত্র ৬০০! নিজেরা দেবে না অথচ অন্যদেরও দিতে দেবে না!’
বিদেশি ত্রাণ না নেওয়ার কেন্দ্রীয় নীতি বিপাকে ফেলেছে রাজ্য বিজেপিকে। আগামী বছরের লোকসভা ভোটে জিততে দক্ষিণের যে রাজ্যটির দিকে বিজেপির নজর সবচেয়ে বেশি, যে রাজ্যে কংগ্রেস ও বাম জোটের ক্ষমতায় আসার ধারাবাহিকতায় তারা ছেদ টানতে চায়, সেই কেরালায় তারা এখন মুখ লুকোতে ব্যস্ত। এতটাই যে এই রাজ্যের মানুষ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কে জে আলফোনস প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অনুরোধ করেছেন, রাজ্যের স্বার্থে ত্রাণ না নেওয়ার নীতি মাত্র একবারের জন্য লঙ্ঘন করা হোক। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘বিপর্যয়ের তীব্রতা এতই যে একবারের জন্য কেন্দ্রীয় নীতিতে ব্যতিক্রম ঘটানো যেতেই পারে।’ আলফোনস এ নিয়ে বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর যুক্তি, মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে কেরালার সম্পর্কজনিত কারণেই এই ব্যতিক্রম ঘটানো উচিত। সংবাদমাধ্যমের কাছে তাঁর স্বীকারোক্তি, কেরালায় কেন্দ্র যা দিয়েছে তা সিন্ধুতে বিন্দুসম।

কেরালায় ‘অপর্যাপ্ত’ ত্রাণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় চলছে। রাজনৈতিকভাবে এই প্রচার বিজেপির পক্ষে যাচ্ছে না। সামাল দিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ৬০০ কোটি রুপি সাময়িক সাহায্য। ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (এনডিআরএফ) যখন যেমন প্রয়োজন বলবে, তখন তেমন সাহায্য করা হবে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উদ্ধারকাজে নামানো হয়েছে ৪০টি হেলিকপ্টার, ৩১টি বিমান, ১৮২ উদ্ধারকারী দল, সেনার ডাক্তারদের ১৮টি দল, ৫০০ নৌকা ও সশস্ত্র কেন্দ্রীয় পুলিশ। উদ্ধারকারীরা ত্রাণ শিবিরে নিয়ে গেছেন ৬০ হাজার জলমগ্ন মানুষকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে এ কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে, এই সাহায্য ছাড়াও রাজ্যের বিপর্যয় ত্রাণ তহবিলে রয়েছে ৫৬২ কোটি ৪৫ লাখ রুপি যার ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশই কেন্দ্রীয় অবদান।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মুচকুন্দ দুবে ও মিয়ানমারের সাবেক রাষ্ট্রদূত রাজীব ভাটিয়া মনে করেন, বিদেশি সাহায্য না নেওয়ার যে নীতি ভারত আঁকড়ে রয়েছে তা ন্যায্য। ভারতের শক্তিশালী অর্থনীতি যেকোনো ধরনের বিপর্যয়ের মোকাবিলায় সক্ষম। রাজীব ভাটিয়া প্রথম আলোকে বলেন, দুর্ভাগ্যের কথা, বিষয়টিতে রাজনৈতিক রং লেগে গেছে। যে বন্ধু দেশগুলো নিজে থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, ভারতের উচিত বিনীতভাবে কূটনৈতিক স্তরে তা প্রত্যাখ্যান করা। মুচকুন্দ দুবে অবশ্য মনে করেন, ওই সাহায্য গ্রহণ করলে তা নীতি লঙ্ঘন হবে না। কারণ, ভারত আবেদন জানায়নি। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো নিজে থেকেই এগিয়ে এসেছে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, কেরালার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর একটা আত্মিক সম্পর্ক বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে। আমিরাত বা কুয়েত যা করেছে, তা ঐকান্তিক।